আমি বিয়ে করব না কাকু ( ১ )

 সেদিন ছেলেপক্ষ আমাকে দেখে গেল। আজ আমি তাকে দেখতে গেছিলাম। রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। সে একা আসেনি, তার সাথে তার সিনিয়র জুনিয়র ভাই-ব্রাদার ছিল। কথায় কথায় তার এক বন্ধু সেজান আমায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কেমন? নিজেকে এক শব্দে বর্ণনা করুন।ʼʼ


আমি না ভেবেই বললাম, “লোভী। আসলে আমি স্বার্থপর, জঘন্যমানের স্বার্থপর। আর লোভ স্বার্থের মধ্যেই পড়ে।ʼʼ


অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “লোভটা কীসে আপনার?ʼʼ


-“সবকিছুতে। তবে টাকার প্রতি দূর্বলতাটা বেশি।ʼʼ


-“উমম! তো টাকার জন্য কী করতে পারেন?ʼʼ


-“সম্মান ছাড়া সব দিতে পারি।ʼʼ


-“জানও?ʼʼ সন্দিহান স্বরে বলল।


-“হ্যাঁ, জানও।ʼʼ


-“জানই যদি চলে যায়, তাহলে টাকা দিয়ে কী করবেন?ʼʼ


আমি হাসলাম, “আপনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'অভাগীর স্বর্গ' পড়েছেন?ʼʼ


এবার সেই লোক কথা বলল, “ওটা শরৎচন্দ্রের লেখা। ইচ্ছে করে ভুল বলার কারণ কী?ʼʼ


অল্প হাসলাম, “কারণ আছে। আপনাদের কারোই যদি কোনো ধারণা না থাকে গল্পটা সম্বন্ধে, তাহলে আমি বললেই তো আর পুরো ব্যাপারটা বুঝবেন না।ʼʼ 


সেজান বলল, “আমরা তো জানিনা, আমাদের বলুন।ʼʼ


-“বেচারী অভাগী বিশ্বাস করতো, তাকে চিতায় পুড়ালে সে স্বর্গে যাবে। কিন্তু টাকার অভাবে চন্দন, খড়ি, ঘি জোগাড় হলোনা বলে তাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হলো। তার মানে কী দাঁড়াল? মরার পরে ভালোভাবে মৃতদেহ সৎকার করবার জন্যও টাকার দরকার। আবার জিয়ারত-চল্লিশা এসবেও টাকা লাগে। টাকা রেখে মরলে লোকে বলবে, বড়লোক মানুষ মরেছে, কত সম্পদ রেখে গেছে। এখানেও একটা বড়লোকি ক্রেডিট আছে।ʼʼ


সেই ভদ্রলোক আর কোনো কথা বলছিল না। চোখ তার টেবিলের ওপর। কেউ আর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল না। পরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা। আপনি ভাইকে কেন বিয়ে করছেন?ʼʼ চোখে-মুখে সন্দেহ ওদের।


-“করছি নাকি?ʼʼ


-“করছেন না? তাহলে দেখা করতে এসেছেন কেন?ʼʼ


-“আপনারা ডাকলেন, এলাম। না এলে অসভ্য ভাবতেন।ʼʼ


-“তার মানে আপনি বিয়ে করবেন না?ʼʼ


-“আসার পর থেকে এমন কিছু তো বলিনি!ʼʼ


-“মানে? করবেন?


-“সেটাও বলিনি।ʼʼ


-“কী দিয়ে কী বলছেন?ʼʼ 


-“আমি কিছু বলছি না তো। জবাব দিচ্ছি শুধু।ʼʼ


গোমরা মুখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সেজান গম্ভীর হয়ে বলল, “ভাই যদি আপনাকে বিয়ে না করে?ʼʼ


-“তাহলে আর কী? আব্বুকে আবার নতুন ছেলে দেখতে হবে।ʼʼ


-“ওহ! তার মানে আপনার যে কেউ হলেই চলবে, বিয়ে করে ফেলবেন?ʼʼ


-“ছেলেদের নাকি একটাই চাহিদা থাকে, মেয়ে খালি জীবিত হলেই চলবে। আমার সেটাও নেই, বর জীবিত না হলেও চলবে। বরং দৌঁড়াবে, ইভেন আমি ওটাই চাই। খালি লোকটা বড়লোক দেখে বিয়েটা হয়ে গেলেই হলো।ʼʼ


ভ্রু কুঁচকাল, “কীহ! বুঝলাম না।ʼʼ


-“বোঝাচ্ছি। দেখুন, এই বাপ-মা, সমাজ বিয়ে না দিয়ে তো ছাড়বে না। কিন্তু বিয়ে-শাদীতে আমার পোষাবে না। আমি ভণ্ড মানুষ, ওসব ঘর-দোর সামলানো আমার কর্ম না। কিন্তু বাপ-মা সম্প্রদায়কে আপনি যতই আধ্যাত্মিক জীবনের মারপ্যাচ বোঝান, এরা বুঝবে না। তাই এদের মুখ বন্ধ করার জন্য একটা বিয়ে করতেই হবে। তো আমি করব। আর তা যার-তার সাথে হয়ে আব্বুর ঘ্যানঘ্যান ফুরোলেই হলো। তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্বামীর যদি আমাকে পছন্দ না হয় বা ওই ব্যাটা যদি বেঁচে না থাকে।ʼʼ


-“এটা কীভাবে ভালো হলো?ʼʼ 


-“বলছি।ʼʼ


সোজা হয়ে নড়েচড়ে বসল সবগুলো।  


আমি বললাম, “আসলে সংসার আমার কাছে বিনা রকেটে চাঁদে যাবার মতো। যেটা আমি কোনোদিন করতে পারব না। তাই স্বামীর যদি আমাকে পছন্দ না হয় তাতে সে আমার কাছে ঘেঁষতে আসবেনা, ওসব ল্যাদামার্কা মিল-মহব্বতের সংসার সাজাতে হবেনা। আমি সারারাত ছাঁদে হাঁটব, সকাল থেকে দুপুর অবধি ঘুমাবো, এরপর উঠে খাব, বই পড়ব—বিন্দাস লাইফ। এদিকে বাপও শান্ত, মেয়ে তার সংসার করছে। কিন্তু জামাই মরার যে বেশি সুবিধাগুলো, তা হলো— হুট করে তার আমার ওপর মন ঘুরে যেতে পারে, বা বোঝেনই তো ব্যাডা মাইনষের কথা! তার ওপর ঘর শেয়ার করার ঝামেলা, ঘরে কেউ থাকলে অস্থির অস্বস্তিকর ব্যাপার, একটা এক্সট্রা মুসিবত। জামাই মরা হলে এইসব রিস্ক থাকবে না। আর যদি টাকা-পয়সাওয়ালা হয়, তাইলে তার ফেলে যাওয়া সম্পদে আমি আয়েশ করে জীবন যাপন করব। বই কিনে লাইব্রেরী বানাবো, ঘুরতে যাব, খাব, বই পড়ব। ওদিকে বাপ দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললে, বলব, 'আমি পতিব্রতা। বিয়ে একবারই হয়, আব্বু। একবারই হয়।ʼ বলেই মুখে আচল গুজে দৌঁড়ে গিয়ে বিছানায় পড়ব। আপনি কি বুঝতে পারছেন আমার কথা?ʼʼ


সকলে হাঁ হয়ে শুনছিল। এবার ঘাঁড় ঝাঁকালো, “হু, বুঝেছি।ʼʼ


-“কী বুঝলেন?ʼʼ 


-“আপনি স্বার্থপর না, আপনি ডাকাত। তবে ভণ্ডামিটা বুঝলাম না।ʼʼ


-“ওটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। তা বুঝলেই বরং অস্বাভাবিকʼʼ আমি মুচকি হাসলাম। 


সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভদ্রলোক এবার হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে টিবিলের ওপর হাত রাখলেন। হাতঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “আমাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছ, এর পেছনেও নিশ্চয়ই বিশেষ কারণ, স্বার্থ অথবা ভণ্ডামি আছে? আর আমি কিন্তু জীবিত।ʼʼ


-“শুনলাম, আপনাদের তিনতলা বাড়ি আছে। ব্যবসা আছে, দুটো গাড়িও আছে। আর তাছাড়া আপনি ভালো মানুষ। আমার মতো ভণ্ড, ভবঘুরেকে আপনার পছন্দ হবেনা, বনিবনাও হবে না। আমার চলবে।ʼʼ


ওরা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। সেই লোকটা জিজ্ঞেস করল, “তোমার বই পড়ার খুব শখ, ঠিক বলেছি?ʼʼ


-“না, ঠিক বলেননি। শখ না, ওটাও এক প্রকার ভণ্ডামি। বই আমি পড়ি যতটা, কিনি তার চেয়ে বেশি। বই নিয়ে বসে থাকা আর নাড়াচাড়া করাটা শখ। বই পড়িনা আমি, সংগ্রহ করি।ʼʼ


রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখলাম, ওরা সবাই মিলে কাউকে কল করছে। আমি মুচকি হাসলাম। এরপর দেখলাম, সেই ভদ্রলোক ঘাঁড় ঘুরিয়ে একবার দেখল আমায়। আমি নিশ্চিত ওরা বাড়ির বড়দের কল করছে। আমার মতো জিনিসকে বাড়িতে তোলার মতো পাগলামি কোনো পুরুস্কারপ্রাপ্ত পাগলও করবে না। এ জীবনে আর এদের মুখ দেখতে হবে না। তবে লোকটার হাসিটা চমৎকার ছিল। তাতে কী! আমি তো আর বিয়ে করব না। আজ এর হাসি ভালো লেগেছে, রাস্তায় আরেকজনকে দেখলে তাকে ভালো লাগবে। এই রঙধনুর মতো মন নিয়ে আমি যাকে দেখি তাকেই ভাল্লাগে। তাই বলে বিয়ে তো করা যাবেনা!


রিক্সার হুড লাগিয়ে একটা গাঢ় শ্বাস টেনে হাসলাম। আমার পরিকল্পনা সফল। আসলে বিয়ের পর মরা জামাই অথবা পরকিয়াকারী জামাইয়ের ওসব উপভোগ করার হিসেবটাও একটা ভণ্ডামি। যদি বাই এনি চান্স বিয়ে করতেই হয়, তো ওই ট্রিক্স এপ্লাই করা যাবে। কিন্তু আগে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে বিয়ে নামক মুসিবতকে দূরে রাখার। এসব বলে একের পর এক লোক ভাগাতে পারলেই তো বেশ আমার বাপের বাড়ি চাঙ্গা দিন কেটে যাচ্ছে। বই পড়ছি, খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, রাতভর ছাদে হাঁটছি, ধুমধারাক্কা গান বাজিয়ে নাচছি—ফুরফুরে দিনাতিপাত যাকে বলে। 


পরেরদিন সকালে সবে হুমায়ুন আহমেদের 'নক্ষত্রের রাত' উপন্যাসটা পড়তে পড়তে সেটা রেখেই চোখ বুজেছি। তখন সকাল সাতটা। দরজায় দুমদুম করে বাড়ি পড়ছিল। এভাবে আমাকে বাড়িতে কেউ ডাকেনা। ঘুম ভাঙালে আমি আবার শু-য়ো-র হয়ে যাই। অতএব, কেউ ডাকেনা।


দরজা খুলে হাই তুলতে তুলতে হেঁটে বসার রুম অবধি গিয়ে চোখ তুলতেই মাথাটা ঝনঝন করে উঠল। 


কালকের সেই পুরো দলবল পার্টি তো আছেই। সাথে তাদের বাড়ির বড়রাও লাইন ধরে সোফায় বসা। সেই লোক একবার আমার দিকে তাকিয়ে মেঝেতে চোখ নামালো।


তারা কি আমার নামে নালিশ করতে এসেছে আব্বুজানের কাছে, অথবা.....


আমি কি ফেঁসে গেছি?😬


#আমি_বিয়ে_করব_না_কাকু

~তেজস্মিতা মুর্তজা

Next part 


[বহুদিন আগের লেখা। এটা একটা আওলা-ঝাওলা, যাতা-মাতা টাইপের লেখা। কোনো আগা-মাথা নেই। ছাতার ওপর ব্যাঙের মাথা–যাকে বলে।]



Post a Comment

0 Comments