পর্দা





#পর্দা

"আমি কালকে একটু বেরোবো! "

"কোথায়? "

"নিউমার্কেট যেতে হবে।"

"আবার কী কেনা বাকি আছে? সব কেনাকাটা শেষ না?"

"পর্দা কিনতে হবে, এই পর্দাগুলো ফেইড হয়ে গেছে! "

আশিকের মুখ রাগে বিরক্তিতে কালো হয়ে গেছে, থমথমে গলায় বললো, "দেখো লুবনা, তোমাকে আগেই বলেছি, সাদিয়ার হাতের কোনো জিনিস চেঞ্জ করা যাবে না! "

আহত গলায় বললো লুবনা, "আচ্ছা! "

লুবনা সরে গেলেও বিরক্তিটা রয়েই গেল, মাথা ঠাণ্ডা করতে নিচে নামলো আশিক। সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে বহুদিন আগে, কিন্তু এইসব বিরক্তির মুহূর্তগুলোতে সিগারেটের মাথায় অগ্নিসংযোগ না করা পর্যন্ত রাগ দমিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।

মোড়ের দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে আগুন ধরাতে ধরাতে আশিক লক্ষ্য করল তার হাতটা অল্প অল্প কাঁপছে।

কী আশ্চর্য! নার্ভাসনেস? না বিরক্তি?

সাদিয়ার মৃত্যুর পরে কেটে গেল পাঁচ বছর, লুবনা এসেছে সেও এখন তিন বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও সময়ে সময়ে লুবনাকে সহ্য হয় না এখনো।

শালার বাচ্চাটা না থাকলে কে বিয়ে করত আবার? আম্মুর চাপাচাপিতেই না বিয়ে করতে হলো! নিজেদের গরীব আত্মীয়ের মধ্যেই লুবনাকে বেছে এনেছে আম্মু যাতে আয়শার অযত্ন না হয়।

পরশু দিন ইদ, সৌদি আরবে চাঁদ উঠেছে আজকে। কালকে সৌদি আরবে ইদ হলে বাংলাদেশের ইদ হবে পরশু দিন।

সিগারেট টেনে মাথা ঠাণ্ডা করে বাসায় ফিরে এসে দেখল নিচে হৈচৈ করছে দারোয়ান।

"কী হয়েছে, মানিক মিয়া? "

মানিকের মুখে লাজুক হাসি, "দেখেন তো স্যার, এইবার ইদে ছুটি পামু না তাই আমার বউ মামাতো ভাইয়ের লগে চইলা আসছে বাড়িত্থে!"

"তাই নাকি? " কৃত্রিম আগ্রহ দেখাল আশিক।

ঘোমটা টানা মেয়েটা হেসে ফেললো ফিক করে, হাসির দমকে খসে পড়ে গেল ঘোমটাটা। খুব বেশি বয়স না, হবে আঠারো বছর।

"অহন স্যার আমি অরে রাখমু কই?"

গুরুতর সমস্যা। আশিকদের বাসায় দারোয়ান দুজন।

একেক ইদে একেকজন পালা করে ছুটি পায়।

মানিক মিয়া ছুটি কাটিয়েছে গত বছর, তাই এবার ইদে তার ডিউটি করার কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার রুমের সঙ্গে লাগোয়া ড্রাইভারের রুম। দুই রুমের মাঝখানে জানালা।

নতুন বউ নিয়ে থাকতে গেলে কিছু প্রাইভেসি প্রয়োজন হয় বইকি!

খুব বেশি মাথা ঘামাল না আশিক। সিগারেটের গন্ধ আড়াল করার জন্য একটা চিউয়িংগাম চিবুচ্ছিল।

চিবানোর গতি বাড়িয়ে দিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, "আসছে বসাও, হাত মুখ ধোয়ার পানি দাও! আমি তোমার ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি! ইফতার তো রাস্তায় পড়েছে মনে হয়? "

কাউকে কিছু না বলেই দরজা ভিজিয়ে রেখে নেমে গিয়েছিল আশিক, তাই খোলাই ছিল দরজাটা। আস্তে করে সে যখন ভেতরে ঢুকল ডাইনিং এ বসে লুবনা তখন আয়শাকে খাওয়াতে ব্যস্ত।

জোরে জোরে মাথা নাড়ছে আয়শা, কী একটা কথায় খুব হাসছে লুবনা। হাসি থেমে গেল আশিককে দেখে।

আশিক তাকাল না ওর চোখের দিকে, সাদিয়ার জায়গায় অন্য কাউকে সহ্য করা মুশকিল।

ঘরে এসে পর্দার গায়ে হাত রাখল আশিক, গোলাপি রঙের পর্দার সঙ্গে গোলাপি রঙের বিছানার চাদর, খুব শখ করে কিনেছিল সাদিয়া।

প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার অতিরিক্ত রক্তপাতে যখন চুপচাপ মরে গেল সাদিয়া আশিক তখন গিয়েছিল ওদের বাচ্চার এন আই সি ইউ ভর্তির প্রসেসিং করতে। আর কী আশ্চর্য! আশিক ফিরে আসতে আসতে চুপচাপ মরে গেল সাদিয়া।

আশিকের চোখ জ্বালা করে উঠল। বিছানার চাদরটা খানিক ছিঁড়ে গেছে সেই যুক্তিতে বাতিল হয়ে গেছে আগেই, এবার কি তবে সাদিয়ার হাতের শেষ স্মৃতিচিহ্ন পর্দাটাও সরে যাবে লুবনার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে?

ঘোর কেটে গেল আশিকের। ডাইনিং এ এসে দেখল খাওয়া শেষ হয়ে গেছে আয়শার।

গলা পরিষ্কার করে বললো, "নিচে দারোয়ানের বউ এসেছে, ইফতারের কিছু লেফট ওভার থাকলে দিতে পারবে?"

"দিচ্ছি! কিন্তু সে থাকবে কোথায়? "

গুরুতর সমস্যা। দারোয়ান আর ড্রাইভার থাকে লাগোয়া রুমে, দুই রুমের মাঝখানে জানালা।

সমাধান করে দিলো লুবনা নিজেই, "মেয়েটাকে বলবো রাতে আমাদের এখানে চলে আসতে! "

হাই তুলে বললো আশিক, "আচ্ছা! "

ইফতারে বেঁচে যাওয়া খাবার গরম করে গুছিয়ে নিচে ইন্টারকমে ফোন করে দারোয়ানকে নিয়ে যেতে বললো লুবনা। খাবার নিয়ে যাওয়ার সময় বললো, "বউ থাকবে কীভাবে তোমাদের মধ্যে, রাতে ঘুমানোর আগে পাঠিয়ে দিও আমার এখানে! ড্রয়িং রুমে এসে শুয়ে থাকবে। "

মানিক মিয়া নিষ্প্রাণ হাসি ঝুলিয়ে রেখে ছোট একটা শ্বাস ফেলে বললো, "আচ্ছা! "

ফোনটা নিয়ে আধশোয়া হয়ে ছিল আশিক। সম্বিত ফিরে এল আয়শার কান্নার শব্দ পেয়ে।

কাগজ কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে মেয়ে।

লুবনাকে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বললো সে, "কিছু খেয়াল কর না কেন? ও কাঁচি পেল কোথা থেকে? "

নি:শব্দে আয়শাকে নিয়ে উঠে চলে গেল লুবনা, মেয়ের হাত খুব বেশি কাটেনি। অল্প কিছু সময় পরেই বন্ধ হয়ে গেছে রক্তপাত।

ওকে ব্যাণ্ডেজ় করে দিয়ে বিছানায় শুইয়ে রেখে রান্নাঘরে চলে গেল লুবনা। খুব বেশি খারাপ লাগছে আশিকের, অপরাধবোধে বিদ্ধ হচ্ছে।

কেন এমন হয়, কেন নিজেকে সামলাতে পারে না সে?

আশিক রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াল। মুখ তুলে বললো লুবনা, "তুমি তো খাওনি, খাবে এখন? "

নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললো আশিক, "স্যরি! "

মাথা নাড়ল লুবনা, "আচ্ছা! "

"তোমার কখনো রাগ উঠে যায় না আমার দিকে? "

"যায়! আমি তখন ভাবি, তোমারও তো আমার মতোই কষ্ট হচ্ছে! "

"মাম, শুতে আসবে না?" পেছন থেকে ভয়ে ভয়ে বললো আয়শা। হাত কেটে যাওয়ার পরে আব্বুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে সে জানে।

ফিরে তাকাল আশিক। লুবনা আয়শাকে মাম ডাকতে শিখিয়েছে। আচ্ছা সাদিয়া থাকলে কী ডাকতে শেখাত? আম্মু? মামনি?

ওর দিকে তাকিয়ে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে হাসলো আশিক।

"আসবে! "

কলিং বেল বাজল সেই সময়, দরজা খুলে লুবনা দেখল দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে বউকে নিয়ে।

"এসো!" দরজা ছেড়ে সরে গেল লুবনা।

"লুবনা ", ডাকল আশিক, " ওকে বলে দাও এখানে থাকতে হবে না। "

জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল লুবনা।

"আমাদের ভেতরের দরজার পর্দাটা খুলে দিয়ে দিচ্ছি। কালকে নিউমার্কেট থেকে কিনে নিয়ে এসো নতুন পর্দা! "

লুবনার বিস্মিত দৃষ্টির সামনেই পর্দা খুলে এনে দিলো আশিক। দারোয়ান আর তার বউয়ের মুখে চাপা হাসি, দুজন দু জায়গায় থাকার কথা ভেবে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাদের।

খুব ভালোবাসা নিয়ে পর্দা কিনেছিল সাদিয়া, আজও একই ভালো লাগা নিয়ে পর্দা হাতে নিল মানিক। কৃতজ্ঞতা আর আনন্দে বিমোহিত হয়ে হাসলো।

লুবনা তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। আশিককে বুঝতে চেষ্টা করছে।

মেয়েকে কোলে তুলে নিল আশিক। কোমল গলায় বললো, "স্যরি! আমি আর তোমাকে কষ্ট দেবো না!"

আশিক জানে সাদিয়ার ভালোবাসার কেনা পর্দার আড়ালে আজকে লেখা হবে নতুন গল্প।

সেই সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কতো শত কোটি গল্পই না লেখা হচ্ছে, তবুও পুরনো স্মৃতি পুরনো গল্পরা মুছে যায় না, ভেসে বেড়ায় দাপটের সাথে। কখনো ফাল্গুনী হাওয়ায় কখনো বা প্রচণ্ড রোদে এক ঝলক শীতল বাতাসের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখায়।

-মৌলী আখন্দ


Post a Comment

0 Comments