উঁচকপালি খুশবু 🌺🦋#সমাপ্ত🦋🌺

 #উঁচকপালি_খুশবু|| অন্তিমপাতা||

#তাসনীম_তামান্না



প্রকৃতির আজ মনখারাপ বোধহয় সূর্য্যিমামার দেখা নাই। মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। দমকা বাতাস বইছে। যেকোনো সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। খুশবুর আজ খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করছে ও খাদিজা বেগমকে নিজের ইচ্ছের কথা জানাতেই তিনি খুশি হয়ে রান্নার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। খুশবু নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করছে এভাবে না খেয়ে থাকলে তার ও বাচ্চা দু'জনেরই ক্ষতি তার কিছু হলে বাচ্চাটাকে কে দেখবে। তার তো মা ছাড়া দুনিয়াতে কেউ নেই। ও পেটে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল “তোর মা তোর সাথে আছে জান বাচ্চা। তোর বাবা সাথে না থেকেও আমাদের সাথে আছে। বুঝেছিস মন খারাপ করবি না।”


খুশবু আয়মানের ছবি বের করে চুমু খেয়ে বলল “আমার তোমার ওপরে কোনো রাগ, অভিমান, অভিযোগ কিছু নেই। আল্লাহ তোমাকে মাফ করুক। তুমি ভালো থাকো এই টুকু চাই। আর আমাদের নিয়ে চিন্তা করো না আমি আর আমাদের বাচ্চা ঠিক আছি।” ছবিখানা বালিশের নিচে রেখে ও ভেজা চুলগুলো খোঁপা করে মনের শান্তির জন্য নিজেকে সৃষ্টি কর্তার কাছে সোপে দিলো।


একটা ছোট রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে দুজন। রিনা অবাক হয়ে সাইমনের কথা শুনছে যেনো মুভির কাহিনী ও বলল “তার মানে আগে থেকে ভালোবাসতেন?”


–হুম। সেটা মাকেও বলেছিলাম মা মামার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে বলে নি।


–খুশবুকে অন্তত জানাতে পারতেন। মেয়েটার সাথে বিয়ে হলে ওকে আর এতো কষ্ট সহ্য করতে হতো না।


–আমি তখন বেকার ছিলাম কোন মুখে বলতাম।


–যাকগে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন বিয়ে করে সুখি হবে।


–হুম কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। খুশবু মন থেকে আয়মানকে ভালোবাসে বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসলে ওর সাথে থাকলে সারাক্ষণ ওর আয়মানের কথা মনে পড়বে। আমার প্রতি ওর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে না।


–হ্যাঁ তা ঠিক। তাহলে বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসার সাথে সাথে তাকে অনাথ আশ্রয়ে দিয়ে আসবেন?


–আপনার মনে হয় খুশবু এটা করতে দিবে?


–তাহলে কী করবেন? ও তো এ্যাবর্শন করাবে না বলেই দিয়েছে। 


সাইমন হেসে পলিথিনে মেড়ানো ঔষধ এগিয়ে দিয়ে বলল “এখন ঔষধেই কাজ হয়। আমি ডক্টর ফ্রেন্ডের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি তাছাড়াও অনেক ডক্টর গাইনি চিকিৎসকের কাছে শুনে পরামর্শ নিয়েই এনেছি। একটু কষ্ট হবে বাট আমাদের ফিউচারের জন্য ভালো। কোনো বাঁধা থাকবে না।”


রিনা অবাক হয়ে বলল “সাইমন ভাই, আপনি তো দেখছি পাক্কা খেলোয়াড়! সব প্রস্তুতি করেই আসছেন।”


–খুশবুকে পাওয়ার জন্য আমি সব করতে পারি।


–আয়মান ভাই মারা না গেলে কী তাকেও… ওয়েট আপনি কী তাকেও

কথাগুলো বলতে বলতে রিনার চোখগুলো বৃহৎকার হয়ে গেলো। সাইমন হেসে বলল “বুদ্ধিমানের জন্য দেখছি ইশারাই যথেষ্ট! থাক সে কথা! আপনার জেনে কাজ নেই যেটুকু জেনেছেন বুঝেছেন নিজের মধ্যেই রাখুন। কথা এদিক সেদিক হলে আপনিও ফাঁসবেন।”


রিনার বুকটা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে সাইমনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছু ভাবতে পারছে না একটা মানুষ কতটা সাইকো হলে খুশবুকে পাওয়ার জন্য মানুষ খুন করে ফেলতে পারে। সবাই আয়মানের মৃত্যুটা একটা এক্সিডেন্ট ভেবে নিয়েছে যেখানে গাড়ি ব্রেকফেল হয়। আয়মান বুঝতে পেরে ব্যাপারটা বাসায় ফোন দিয়ে জানায়। সবাই যান্ত্রিক ত্রুটিভেবে কেস করে নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে মস্ত বড় এক গল্প যা সকলের অজানা সাইমন নিজে সে গল্প শিকার না করলে কেউ জানতে পারবে না। সাইমন রিনার চুপ থাকা দেখে হেসে বলল “ভাবী ভয় পেলেন না-কি!”


রিনা মুখে মিথ্যা হাসি টানতে ব্যার্থ হলো বলল “না না ভয় পাব কেনো!”


–তা ভয় না পেলেই ভালো। শুনুন ঔষধটা দুধের সাথে মিশিয়ে খাওয়াবেন। ওটা খাওয়ানোর পর কয়েকঘন্টার মধ্যে রিয়াকশন শুরু হবে ওর সাথে থাকার চেষ্টা করবেন। ব্লিডিং শুরু হওয়ার সাথে সাথে ওকে হসপিটালে আনবেন। ডক্টর বলছে ব্লিডিংয়ের সাথেও বাচ্চা নষ্ট নাহলে তৎক্ষনাৎ অ্যাবর্শন করে ফেললে ও বুঝতে পারবে না। 


রিনা অনিচ্ছায় মেনে নিয়ে বলল “আচ্ছা! সময় সুযোগ বুঝে দিবো।”


–নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়াবেন। কথার নড়চড় যেনো না হয়।


–চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে জানাব।


–ঠিক আছে। এখানে শাড়ি আছে ওকে দিবেন। চকলেটগুলো আপনার ছেলের জন্য। আজ তবে উঠি। ও হ্যাঁ এসব কথা নিজের স্বামীকে ভুলেও জানাবেন না। ফলাফল ভালো হবে না।


–ও কিছু জানবে না।


রিনা ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গেলো। মনের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে কতটা খুশি হয়েছিল খুশবুর সাথে সাইমনের বিয়ের কথা শুনে এখন ঠিক ততোটাই অখুশি একমন চাইছে খুশবুর সাথে আর খারাপ না হোক। আরেক মন চাইছে যা হবার হোক আপদটা বিদায় হোক। ও দ্বিধা দ্বন্দ্বের সাথে মানসিক যুদ্ধ চালাতে লাগলো।


~~~

রিনা মন মস্তিষ্কের স্নায়ুযুদ্ধ যুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিলো এখন খুশবুর ভালো চাইতে গেলে সাইমন তার স্বামী সন্তানের ক্ষতি করতে দুইবার ভাববে কিনা সন্দেহ তার ওপরে খুশবুর বিয়ে না হলে তার সংসারেই থাকবে তাই নিজের সার্থের জন্য সে নেতিবাচক দিকটা বেছে নিলো। রাতের বেলা খাওয়ার পর সে অনেক ভয়ে দুধের গ্লাসে ঔষধ মেশলো তার বুকটা যে কী কাঁপছে সে নিজেকে ধাতস্থ করে খুশবুর কাছে গেলো সে চুল বেনি করছে। রিনাকে দুধের গ্লাস নিয়ে আসতে দেখে সে চোখ-মুখ কুঁচকে বলল “ভাবি কী এনেছ! আমি দুধ খাই না জানো না?”


–জানি তবে এখন থেকে খেতে হবে। নিজের জন্য না হোক বাচ্চার জন্য খাও।


–আচ্ছা রেখে যাও আমি খেয়ে নিবো


–আমি দেখব যদি আবার ফেলে দাও।


খুশবু হেসে বলল “আমি কী বাচ্চা!”


–নাহ, বাচ্চার মা। জলদি জলদি খাও।


খুশবু হাসতে হাসতে খেয়ে নিলো। এবং নিজের অজান্তে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা করলো। রিনা গ্লাসটা নিয়ে ধুয়েমুছে রেখে সাইমনকে ম্যাসেজ দিলো “খেয়েছে ভাই।”


ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসলো “সদরে নিয়ে যাবেন। আমি ওখানে সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।”


রিনার অস্থিরতায় ঘুম আসলো না মাঝ রাতে খুশবুর চিৎকার চেঁচামেচিতে সকলে ওর রুমে ছুটে গেলো। খুশবুর ভাই তৎক্ষনাৎ তাকে নিয়ে হসপিটালে গেলো।


খুশবুর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ব্যাথা, ভয় সহ্য করতে না পেরে সে জ্ঞান হারালো। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন পাশে কান্নারত মাকে দেখতে পেলো। মেয়েকে চোখ খুলতে দেখে বলল “মা, ঠিক আছিস? কোথাও কষ্ট হচ্ছে?”

ও উত্তর দিলো না নিজে ক্যানালু করা হাতটা পেটের ওপরে রেখে বলল “আম্মু, আমার সন্তান!”


খাদিজা বেগমের মুখটা ফেকাসে হয়ে গেলো। খুশবু বুঝে গেলো সে তার সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছে। ও পাগলামি করতে লাগলো হাতে স্যালাইন টেনে খুলে ফেললো। হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে নার্সরা এসে ধরলো ঘুমের ইনজেকশন দিলো কিছুক্ষণের মধ্যে সে ঘুমে ঢলে পড়লো।


সেই যে তার চোখ বন্ধ হলো আর খুললো না। সে ব্রেন স্ট্রোক করেছে ডক্টররা সেটা বুঝে উঠে উঠতপএই বাইশ বছর বয়সে মেয়েটা স্বামী হারালো, সন্তান হারালো এবার সে নিজেকে হারালো। হারাতে হারাতে সে ফুরিয়ে গেলো।


সাইমন যেভাবে ভেবেছিলো সেভাবে কিছুই হচ্ছে। সে পাগলের মতো করে খুশবুকে বাঁচাতে চাইলো কিন্তু উঁচুকপালি খুশবুর ভাগ্য সহায় হলো না। খুশবুর চলে যাওয়ার সাথে সাথে তার জীবনের গল্পও শেষ হয়ে গেলো। চাপা পড়ে রইলো অনেক রহস্য যা শাস্তি পৃথিবীতে না হলেও আখিরাতে ঠিক পাই টু পাই হিসাব হবে।


সমাপ্ত

Post a Comment

0 Comments