"আজ কিছু কেনাকাটা করতে হবে,তুমি ঠিক টাইমে মলের সামনে চলে এসো "
ফোন ভাইব্রেশনে থাকলেও অভ্র ম্যাসেজ দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়।
মিটিং শেষ করে অভ্র নিজের ডেস্কে এসে বসার সাথে সাথেই,ফোনটা বেজে ওঠে।
সুকন্যার নামটা ভেসে উঠে স্ক্রিনে।
মেয়েটা তার একমাত্র সহধর্মিণী, যদিও সে স্ত্রীর ধর্ম পালন করে না। সারাক্ষণ হুকুম করে বেচারা অভ্রকে।
"আমি চারটার দিকে চলে আসব,তুমি কখন আসবে?"
"আমার আসার কি খুব প্রয়োজন আছে?"
"হ্যা অবশ্যই, তুমি না থাকলে বিল কে দেবে?"
অভ্র কপাল চাপরায়,নিজে চাকরি করে তারপরও কিছু কেনাকাটা করতে গেলে তারই টাকা দিতে হয়।
কেন রে নিজের টাকা খরচ করলে কি হাত ক্ষয়ে যাবে?
তারপরও একটা শেষ চেষ্টা করলো,
"আমার একটা মিটিং আছে,আমি আসতে পারবা না তুমি ম্যানেজ করে নিও।"
এতোক্ষণ গলার স্বর নরম থাকলেও এখন একটু চওড়া হয়।
"মা কি আমার না তোমার,হ্যা?
আমি তো ছেলের বউ আমার তো এমনিতেই হাজার দোষ,এখন যদি কিছু না করি তাহলেও আমাকে কথা শোনাবে আর করতে চাইছি তা-ও কোনো হেল্প করবে না।
আসলে আমারই দোষ তোমাকে কিছু বলা আর কলা গাছের সাথে কথা বলা একই কথা থাক তোমার আসতে হবে না আমি একটা কালো শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছি।
তোমার মায়ের পছন্দ না হলে আমিই পরবো।"
"এই নাআআআআআ,,,,
ভুলেও কালো শাড়ি কিনবে না আমার মায়ের জন্য।
আমি আসবো।"
ফোনটা কেটে চেয়ারে হেলে বসে।
কতো বড় সাহস আমার মায়ের জন্য কালো শাড়ি কিনতে চায়!মা কালো শাড়ি একদম পছন্দ করে না।
বাবা এই রঙের কিছু মাকে কখনও পরতে দিতো না তাই মা এখনো পরেনা।
আমাকে গাধা মনে করে সে,মায়ের নাম করে নিজের পছন্দের শাড়ি কিনবে তারপর মায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিবে।এদিকে আমার মায়ের তো দয়ার শরীর কিচ্ছু বলবে না হাসি মুখে সব দিয়ে দেয়।
আমি থাকতে তা কখনও হতে দিবনা।ওর চালাকি আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি।
অভ্র মনে মনে এগুলো ভাবছে আর মুখে একটা কুটিল হাসি এঁকেছে।
অভ্রর হাতের কাজ প্রায় শেষ তবুও বউয়ের সাথে শপিং করতে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে বলেছিল কাজ আছে কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলোনা যেতেই হবে
আবার কতোগুলো টাকা যাবে।
কয়েকদিন আগে গেল মা দিবস সেদিনও শুধু শুধু কতোগুলো টাকা নষ্ট করে গিফট কিনলো,যত্তসব ন্যাকামি মায়ের জন্য নাকি বিশেষ দিন লাগে?অভ্রর এসব একদম পছন্দ না।তবুও সংসারের শান্তির জন্য মুখে তালা লাগিয়ে রেখেছিল।
আর আজ জন্মদিনের নাম করে কেনাকাটা করবে,ভাব দেখলে মনে হয় টাকা গাছে ঝুলছে
লাফ দিলেই হাতে আসবে।
যত্তসব আজগুবি কারবার!
এতোদিন অবশ্য এই দিনটা সম্পর্কে কেউ জানতো না,
কয়েকদিন আগে সুকন্যা মায়ের আলমারি গোছানোর সময় কয়েকটা কাগজ পায়,সেখানেই মায়ের সার্টিফিকেটে আসল জন্ম তারিখ টা দেখতে পায়।
যা এই মাসে তা দেখেই শুরু হয় প্ল্যান প্রোগ্রাম।সাথে অরু তো আছেই।মায়ের জন্মদিনের নাম করে এই দুই মহিলা কয়েকদিন ধরে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে অভ্রর।
মায়ের জন্মদিন করবি ভালো কথা,একটু ভালো মন্দ রান্না করে খাওয়া,তা না করে এরা পার্টির আয়োজন করছে!
আসলে এরা মনে হয় ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য নতুন কিছু পাচ্ছে না।
তাই আমার সহজ সরল মা'কে এইবার টার্গেট করেছে।হাজারটা ছবি তুলবে আর ফেসবুক ওয়াল ভড়িয়ে পোস্ট করবে এরা তো এই কাজ ছাড়া আর কিছু পারেনা।
মাঝখানে আমাকে মাসের মাঝেই খালি পকেটে ঘুরে বেড়াতে হবে,কি আর করা এমন মাথামোটা বউ আর বোন থাকলে জীবনে কি আর আর শান্তি পাওয়া যাবে!
মনের কথা মনে চেপে রেখেই অভ্র অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।
সুকন্যা আর অরু আড়ং থেকে বেরিয়ে অভ্রর জন্য রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছে।
অভ্র এই দোকান থেকে কিচ্ছু কিনতে চায় না, এখানে ঢুকলেই নাকি ওর হার্ট এট্যাকের সম্ভাবনা দেখা দেয়,বুকে চাপ লাগে তাই সে এই দোকানের আশে পাশেও আসে না।
কিন্তু মেয়ে মানুষ তো বড় মনের অধিকারী তাদের এতো অল্পতে কিছু হয়না।তারা মন খুলে কেনাকাটা করতে পারে।বেশি বেশি শপিং করলে হার্ট ভালো থাকে তারা এই নীতিতে বিশ্বাসী!
অভ্র অরুকে দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়,এই দুইজন একসাথে থাকা মানে বিরাট খরচ।
আজ শুধু মায়ের জন্য শাড়ি কিনবো,তাই বেশি সময় নষ্ট করবে না।
অরু আর সুকন্যা ওর কথায় সায় দিয়ে দোকানে ঢুকে যায়।
"তুমি তো জানো মায়ের কি রঙ পছন্দ তুমিই শাড়ি সিলেক্ট করো।"
কথাটা শুনে অভ্রর মুখটা মলিন হয়ে যায়।
মায়ের লাল রঙ খুব পছন্দ ছিলো কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে এই রঙটা মা আর পরেনা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভ্র শাড়ি দেখা শুরু করে।
অনেক দেখে শুনে একটা মিষ্টি কালারের জামদানী শাড়ি কিনে নেয় অভ্র দামটা আহামরি কিছু না মাত্র আট হাজার টাকা।
কথাটা অবশ্য সুকন্যা বলছে,তার ভাষ্যমতে,এর সাথে ম্যাচিং জুয়েলারি না হলে শাড়িটা দেখতে ভালো লাগবে না।
তাই বাধ্য হয়ে অভ্র ওদের সাথে জুয়েলারির দোকানে ঢুকে।
ডায়মন্ড কাটের ছোট লকেট সহ চেইন এর কানের দুলের সেটটা সত্যিই সুন্দর।
সুকন্যার নজর আছে বলতে হবে,অভ্র বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটটা দেখছে।
অন্যদিকে অরু আর সুকন্যা একটু ভারী দুইটা সেট দেখছে,সেগুলো ডায়মন্ড কাটের এক্সক্লুসিভ কালেকশন।
অভ্র দোকান ঘুরে নিজের মেয়ের জন্যও একটা ছোট্ট গলার কিনে নেয়।
বিল কাউন্টারে এসে দেখে তার বোন আর বউ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে।
অভ্র বিল দেয়ার জন্য এগিয়ে যায়, পেছনের দুজন মনে মনে এক থেকে দশ গুনছে কারণ যে কোনো সময় বোম ফাটতে পারে!
"কি বলছেন ত্রিশ হাজার টাকা!
এগুলো তো সোনার না,দুইটা সেটের দাম ত্রিশ হাজার টাকা কিভাবে হয়,আমাকে কি বলদ মনে করেন?"
"স্যার দুইটা না,চারটা সেট।"
সেলসম্যান একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলে।
"কিহ্!"
"হ্যা স্যার,ম্যাডাম তিনটা সেট দিয়েছে আর আপনি একটা দিলেন,এই চারটা সেট ভ্যাট সহ দাম এসেছে ত্রিশ হাজার ছয়শো আপনাকে ছয়শো টাকা ডিসকাউন্ট দিয়েছি।"
অভ্র চোখ ছোট ছোট করে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের দিকে তাকায়।
সুকন্যা একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে,জুয়েলারি টা খুব সুন্দর, আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে তাই নিয়ে নিলাম দুই সেট প্লিজ বিলটা দিয়ে দিও।
"আজ শুধু মায়ের জন্য শপিং করার কথা ছিলো, তুমি কেন নিলে?"
অভ্র রাগে কটমট করতে করতে বলে।
"আমি তোমার মা না হলেও তোমার সন্তানের মা তাই আমাকে কিনে দেয়া তোমার স্বামীগত কর্তব্য।"
অভ্র হা হয়ে বউয়ের মুখের দিকে তাকায়।
ঠিক আছে,অরুর টার বিল আমি দিতে পারবো না ওর বড়লোক ডাক্তার স্বামী আছে,ওর টা ওকে দিতে বলো।
এবার সুকন্যা তার আসল রুপে ফিরে আসে।
"এই তোমাদের মতো ছেলেদের জন্য সংসারে আগুন লাগে,তোমরা নিজেরাই বউ আর বোনের মধ্যে ভেদাভেদ করো,আর দোষ হয় শুধু বউয়ের।এখন আমি শুধু নিজের জন্য গয়না কিনলে আমার দোষের পাল্লা বেশি ভাড়ি হয়ে যাবে।
ছোট বোনটা সামনে থাকতে শুধু বউকে কিনে দেয়ার কথা তুমি বলছো।
কিন্তু অরু তো বাইরে গিয়ে আমার নামেই নিন্দা করবে,বলবে আমি আড়ালে তোমাকে এসব শিখিয়ে দিয়েছি।
কি বলবি না?"
অরুকে কনুই দিয়ে গুতা দেয় সুকন্যা।
ওর কথা শুনে অরু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে,তারপরও চোখের ইশারা বুঝে বলে,
"হ্যা,বলবোই তো,আমার ভালো ভাইটা বিয়ের পরই পাল্টে গেছে, আমাকে কিছু কিনে দিতে চায় না আগে কতো কিছু এনে দিতো।
আর এসব কিছু যদি আমার শশুর বাড়ির লোকেরা জানতে পারে তাহলে আমার মান সম্মান কিছুই থাকবে না।ভাইয়ের বউ গুলোই আসল নষ্টের গোরা এতোদিন শুনেছি আজ নিজের চোখে দেখলাম।"
অরুর কথা শুনে সুকন্যার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে কিন্তু মুখটা অনেক কষ্টে গম্ভীর করে রেখেছে।
"থাক অরু মন খারাপ করিস না, সামনের মাসের বেতন পেয়ে আমি তোকে সেটটা কিনে দেব।এবার পুরোনো একটা কিছু পরিস।তা-ও আমার নিন্দা করিস না।"
হ্যা, তাই করতে হবে,তোমার স্বামী শুধু তোমাকেই দেবে এটাই তো ঠিক,আমি তো এখন বাইরের মানুষ বলেই মুখটা কালো করে রাখে।
চলো আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
অভ্রর মুখটা নিজে থেকেই হা হয়ে গেছে।
প্রথমে সুকন্যার যুক্তি শুনে তারপর অরুর দুখে’র কথা শুনে।
এদেরকে কলেজের টিচার বানিয়েছে কে,এদের তো উকিল হওয়ার দরকার, কি যুক্তিরে বাবা!
ওদের যুক্তির কাছে কেউ জিততে পারবে না।
এই দুই ঝগরুটে মহিলার সামনে তো সে নাদান বাচ্চা।অভ্র আর কথা না বাড়িয়ে কাউন্টারের দিকে যায়।
সুকন্যা আর অরু দোকান থেকে বেরিয়ে একটা কোণে এসে দাঁড়ায়, দু'জনেই একসাথে ফিক করে হেসে ফেলে।
ওদের প্ল্যান কাজ করেছে এটা ভেবেই মজা পাচ্ছে কিন্তু অভ্রর মুখটা ভেবে হাসি আটকে রাখতে পারছে না।
সুকন্য আর অরু প্রায় সমবয়সী, তাই বড় ভাইয়ের বউ হলেও তাদের সম্পর্কটা বন্ধুর মতো আবার দুজন চাকরিও করে একই কলেজে তাই বন্ধুত্ব টাও একটু বেশি।
অরু সকালেই সায়নের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে শাড়ি কেনার জন্য।
সায়ন অবশ্য বলেছে ভালো কিছু নিতে মায়ের জন্য।
কিন্তু অরু মায়ের জন্য দুইটা সোনার চুড়ি কিনেছে নিজের টাকায় আর সায়নের টাকা দিয়ে নিজের আর সুকন্যার জন্য দুইটা শাড়ি কিনেছে।
সুকন্যাই বলেছে জুয়েলারি টা তোর ভাইয়ার কাছ থেকে নিবো, তুই শুধু একটু সাথে থাকিস।
সুকন্যা যে এমনভাবে ভাইয়াকে ব্ল্যাকমেইল করবে এটা অরু ভাবতেও পারেনি।
বেচারা অভ্র এই ব্যাপারে কিছুই বুঝতে পারলো না!
গাড়ির পেছনে দুইটা প্যাকেট দেখে অভ্র অরুকে জিজ্ঞেস করে এগুলো কি?
অরু বলে এখানে আমাদের জন্য দুইটা শাড়ি কিনেছি কাল পরবো
টাকা অবশ্য সায়ন দিয়েছে।
"যাক,শুধু আমার মাথায় কাঠাল ভেঙে খাসনি,সায়নের ঘাড়ও ভেঙেছিস।"
কথাটা বলে একটু আরাম করে বসে।এবার মনে হয় অভ্রর বুক ব্যাথাটা একটু কম মনে হচ্ছে।
কলিং বেল শুনে চারু দরজা খুলে দেয়,ছেলে,মেয়ে,বউ তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।ক্লান্তি সবার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।
সুকন্যা ঘরে ঢুকেই বাচ্চাদের খোঁজ করে।
অরুর ছেলে রোদ আর তার মেয়ে মেঘ সারাদিন এই বাড়িতেই ছিলো
দুজনের বয়স প্রায় কাছাকাছি।
অরু যাওয়ার আগে ছেলেকে মায়ের কাছে দিয়ে গিয়েছিল।
এখন দুই ভাই বোন দুই ঘরে বসে আছে,কারণ তাদের মধ্যে খুব মিল কি-না!
একজন চুল ধরে টানে তো আরেকজন খাম*চি দেয়,একজন ড্রইং করে আরেকজন ছিড়ে ফেলে।কিছুক্ষণ আগে এই বাড়িটা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠেছিল তাই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে চারু দুজনকে আলাদা ঘরে রেখেছে।
অরু বাচ্চাদের কাছে যায় আর
সুকন্যা নিজের ঘরের সামনে থেকে হাক ছাড়ে,
"মা একটু চা করো তো,খুব মাথা ব্যাথা করছে তোমার হাতের চা ছাড়া শান্তি পাবোনা।"
"হ্যা, আমি চা বসিয়ে রেখেছি,জানি তোর এটাই লাগবে,আর অরু সায়নকে বলে দে রাতে এখানে চলে আসতে।"
কথাগুলো বলে চারু রান্নাঘরে ঢুকে যায়।
অভ্র সোফায় বসে সব লক্ষ্য করে।
অন্যান্য সংসারে শাশুড়ির ভয়ে বউগুলো ভেজা বিড়াল হয়ে থাকে আর এই ঘরে শাশুড়িকে অর্ডার দিচ্ছে।
ছেহ্ আমার মায়ের শাশুড়ি হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই!
কোথায় বকা ঝকা করে পায়ের নিচে রাখবে তা-না করে বেশি আশকারা দিয়ে ছেলের বউকে মাথায় তুলে রেখেছে।
কোনোভাবে যদি এদের মধ্যে ঝামেলা লাগানো যেতো বেশ হতো!
তবে মনের কথা মনেই রাখে মুখে বললে হয়তো তিন মহিলা তার উপর চড়াও হতে এক মুহূর্তও সময় নেবে না।
রাত প্রায় নয়টা,মেঘ রোদের খাওয়া হয়ে গেছে।খাওয়ার সময়ও ওরা চুলোচুলি করেছে, চারু কাকে আগে খাইয়ে দেবে এই নিয়ে।
অনেক কষ্টে অরু আর সুকন্যা ওদের থামিয়ে ঘরে নিয়ে গেছে।
"আমাদের মতো ভদ্র মানুষের ছেলে মেয়ে হয়ে ওরা দুজন এতো ঝগড়াঝাটি করে কিভাবে?দুইটাই সমান বিচ্ছু,এই বয়সে আমি কতো শান্ত ছিলাম।"
আফসোস করে কথাটা বলে অভ্র।
"তুমি তো বাদরের আপডেট ভার্সন, আর তোমার বোন কামড়াকামড়িতে সেরা তাই তোমাদের বাচ্চারাও সেই পরম্পরা বজায় রেখেছে।ওদের সামনে যদি তোমাদের কেচ্ছা বলি তাহলে হয়তো ওরাও লজ্জা পাবে।
তাই নিজের মুখটা বন্ধ করে খাওয়া শুরু কর"
চারু কথাগুলো বলে চেয়ার টেনে বসে,আমার নাতি নাতনিদের বিচ্ছু বলে কতো বড় সাহস!
অভ্রর মুখটা দেখার মতো হয়ে যায়।
সুকন্যা পেছনেই ছিল শাশুড়ি কথাগুলো শুনে দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায় হাসি আটকে রাখা তার কর্ম না।
"মা তোমার প্রিয় খাবার কি?"
কথাটা অরু জিজ্ঞেস করলেও সবার চোখ চারুতে নিবন্ধ।
সায়ন আসতে পারেনি একটা ইমারজেন্সি পরে গেছে তাই অরু রাতে খেয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে যাবে।
চারু সবাইকে নিয়েই খেতে বসেছিল,তবে মেয়ের কথাটা শুনে হাত থেমে যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই, কি বলবে চিন্তা করছে।
অরু আবার জিজ্ঞেস করে এবার আনমনে চারু উত্তর দেয়,
"ভুলে গেছি!"
"এ আবার হয় নাকি?
প্রিয় খাবার সবার মনে থাকে,এই যেমন আমি মাছের কালিয়া পছন্দ করি,তুমি তো প্রায়ই আমার জন্য এটা রান্না করো,আবার ভাইয়া ঝাল ফ্রাই পছন্দ করে এটাও তুমি রান্না করো তাহলে তোমারট ভুলে যা-ও কিভাবে?"
অরু প্রশ্নটা করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
চারু একটু হাসে,হাসিটা কেমন যেন প্রাণহীন।
"তোমাদের প্রিয় খাবার আমি জানি,আমি করে দেই আবার নিজেরাও করে নিতে পারো।
তাই তোমাদের মনে থাকে আমার সেই সুযোগ ছিলো না তাই আমার মনে নেই।"
"আমার মনে আছে ছোটবেলায় দেখতাম তুমি প্রতিদিন কোনো না কোনো ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে।"
অভ্রর কথা শুনে চারু মলিন হাসে।
"গ্রামের সবাই এসব ঝাল ভর্তা খায় এটা আলাদা কিছু না,মা তোমার ছোটবেলার প্রিয় খাবারের কথা বলো।"
কথাটা বলে সুকন্যা চেয়ার টেনে বসে।
"জানিস আমি ছোটবেলায় খাওয়া নিয়ে খুব বায়না করতাম, এটা খাই না ওটা খাই না এমন করতাম।
আর একদম ঝাল খেতে পারতাম না,মা আমার জন্য কম ঝালের তরকারি রান্না করতো,বাড়ির একমাত্র মেয়ে থাকার জন্য একটু বেশি আদরে বড় হয়েছিলাম।
কিন্তু বিয়ের পর সব অন্য রকম হয়ে যায়।শশুর বাড়ি ছিলো গ্রামে আমি সেখানেই থাকতাম, অভ্রর বাবা মাসে দুই একবার বাড়ি আসতো।
বাড়ি ভর্তি মানুষ,আর বউ আমি একা।
টুকটাক কাজ পারলেও সবকিছু করতে পারতাম না।নতুন জায়গা, নতুন পরিবার মানিয়ে নিতে হিমসিম খেতে হতো।শাশুড়ি মা একটু কড়া ধাঁচের ছিলেন,তার উপর কিছু বলা যেতো না উনার কথামতো প্রতিদিন রান্না হতো।
একদিন শশুর মশাই বাজার থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে আসে আমি খুব খুশি হয়ে মাছ কাটতে বসি সামনে শাশুড়ি মা-ও ছিলেন।
কথায় কথায় তাকে বলি,"ইলিশ আমার সবচেয়ে প্রিয় মাছ,বাবার বাড়িতে এই মাছ রান্না হলে আমাকে বেশি করে দিতো মা।"
"বউদের এতো নোলা থাকতে নেই,এই বাড়িতে এসব হয় না,বাড়ির কর্তাদের পাতে পরলেই হলো তারপর যদি থাকে তবেই বউরা পাবে।"
শাশুড়ি মায়ের কথায় খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন।বুঝেছিলাম আমার পরিচয় বদলে গেছে আমি এখন বাড়ির বউ আমার কোনো প্রিয় খাবার থাকতে নেই।
আমি অবশ্য হাসি মুখেই এই পরিবর্তন টা মেনে নিয়েছিলাম।
প্রায় দিনই সবার শেষে আমার পাত পরতো,তরকারির বাটি ততোক্ষণে শেষ হয়ে যেতো।একদিন দুপুরে খেতে বসে দেখি কচুর মুখীর ঝোল পরে আছে বাটির তলানিতে কিন্তু আমি তো মুখী খাইনা!
সেদিন শাশুড়ি মা বলেছিলেন, "বউদের খাওয়ার এতো বাছবিচার করতে নেই একটা সিদ্ধ ভর্তা করে নিলেই হয়ে যায়।"
সেদিন কয়েক ফোটা চোখের জল পরেছিল ভাতের থালায়।
তবে না খেয়ে তো আর থাকা যায় না তাই এরপর থেকে নিজের জন্য আলাদা করে একটু ঝাল ভর্তা করতাম যেনো অল্প একটু দিয়ে খাওয়া হয়ে যায়।
প্রথম প্রথম চোখে জল আসলেও খেয়ে নিতাম।হয়তো এভাবেই এগুলো আমার পছন্দের খাবার হয়ে গেছে।
এরপর ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য অভ্রর বাবার সাথে শহরে চলে আসি এখানে নিজের আলাদা সংসার হয়।
অভ্রর বাবার তেমন কোনো পছন্দ ছিলো না আমি ভালোবেসে পাশে বসে খাবার বেরে দিলেই সে খুশি হতো,তবুও তাকে জিজ্ঞেস করে তার পছন্দ মতো রান্না করতাম। এরপর বাচ্চাদের প্রিয় কিছুও যোগ হলো।
ওদের পছন্দের কিছু করলে ছেলে মেয়েরা ভালোবেসে খেতো এটাতেই আমি খুশি।ওদের মুখে হাসি দেখলেই আমি তৃপ্তি পেতাম।"
এতো কিছুর মধ্যে আমার প্রিয় কি ছিলো তা ভুলেই গিয়েছি।
চারু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেক দিন পর কথাগুলো মনে হওয়ায় চোখ ভিজে উঠেছে।
টেবিলে বসা সবার চোখ যে কখন ভিজে গেছে কেউ বুঝতেই পারেনি।
অভ্রর মনে পরে ছুটির দিনে মা ওদের জিজ্ঞেস করতো আজ কি খেতে ইচ্ছে করছে?
সেই মতো ওদের চাহিদা মতো খাবার দিয়েই টেবিল সাজিয়ে দিতো।
মা আলাদা করে নিজের জন্য কিছু করতো না।
অভ্র উঠে এসে মা'কে জড়িয়ে ধরে বলে,"বউদের প্রিয় খাবার না থাকলেও মায়ের প্রিয় খাবার থাকতে হয়।এবার বলো কি খেতে ভালোবাসো?"
চারু চাইলেও মন খারাপ করে থাকতে পারেনা।
ও হেসে বলে আছে তো আমার প্রিয় খাবার।
এবার অরু আর সুকন্যা মায়ের দিকে তাকায়।
"অরু যে চিলি চিকেন রান্না করে ওটা খুব ভালো হয়,আর সুকন্যা যে পুডিংটা বানায় সেটাও ভালো হয়।
আমি তো বাইরের খাবার বেশি খাই না ওদের এই রান্নাগুলো খুব ভালো লাগে।"
এতোক্ষণে সবার মুখে হাসি ফুটেছে।
আজ সারাদিন সব আয়োজন করলেও এই ব্যাপার টা ঠিক করতে পারেনি।
সুকন্যা এখনো ভেজা চোখে শাশুড়ির দিকে তাকায়,বিয়ের পর প্রথম থেকেই মানুষটা তাকে আপন করে নিয়েছিলেন।
তাকে জিজ্ঞেস করতো কি খেতে পছন্দ করে একটু অবাক হলেও আজ বুঝতে পারছে মানুষটা হয়তো নিজের পরিস্থিতিতে ওকে দেখতে চাইতেন না।
সকাল প্রায় নয়টা,অভ্র অফিসের জন্য বেরিয়ে যায়।
মেঘ ঠাম্মির সাথে বসে আছে।
"একটু পর রোদ আসবে আজ ওকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে কাল আমার পুতুলের চুল ছিড়ে দিয়ে গেছে।
আমি ওর গাড়িটা আজ ভাঙবোই ভাঙবো।
ঠাম্মির কাছে সব অনুযোগ করতে করতে খাবার খাচ্ছে।
অরু রোদকে বাসায় দিয়ে
সুকন্যাকে নিয়ে প্রতিদিনের নিয়ম মতো কলেজের জন্য বেরিয়ে যায়।
তবে আজ গন্তব্য অন্য কোথাও!
আজ দুজনেই ছুটি নিয়েছে
অরুর রান্নাঘরে আজ বিশাল আয়োজন চলছে,একজন ভাপা ইলিশ করছে আরেকজন চিলি চিকেন,পোলাওটাও দমে বসানো আছে,ডিমের কোরমা টাও হয়ে গেছে।
মাছের মাথা দিয়ে ডাল হলেই সব শেষ হবে।
পুডিং ফ্রিজে ঢুকেছে অনেকক্ষণ।
বাচ্চাগুলো এখানে থাকলে কাজের থেকে অকাজই হতো বেশি তাই ওদেরকে মায়ের কাছে রেখে এসেছে।
দুপুর দুইটার দিকে সবাই একসাথে বাড়ি ফিরে,এই অসময়ে ওদের একসাথে দেখে চারু একটু অবাক হয়।
সবার হাতে এতো বড় ব্যাগ,অরু মা'কে নিয়ে ড্রইংরুমে বসায়।অন্যদিকে সুকন্যা ঝটপট টেবিল সাজানো শুরু করে।
মেঘ রোদ সব দেখছে ওরা এতো কিছু না বুঝলেও এটা বুঝেছে আজ স্পেশাল ভোজ হবে।তাই আগে ভাগে চেয়ার টেনে বসে পরেছে।
চারু অবাক হয়ে সব দেখে,আজ ওর জন্মদিন সেটা সে ভুলেনি কিন্তু ওরা যে এভাবে আয়োজন করবে সেটাও বুঝতে পারেনি।
সবাই একসাথে বলে উঠে, "শুভ জন্মদিন মা।
তুমি আমাদের ভালো থাকার একমাত্র কারণ।
তুমি ভালো থাকলেই আমদের মুখে হাসি থাকবে তাই আরও অনেক বছর আমাদের সাথে তোমাকে থাকতেই হবে।"
এবার চারু একটু লজ্জা পাচ্ছে, এই বয়সে এতো আয়োজনের কোনো মানে হয়?
চারু খেতে বসে তার পাশে তার চার ছেলে মেয়ে সবাইকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।
মেঘ রোদ অবশ্য একটু রাগ করে এর জন্য ঠাম্মির আদর শুধু তাদের, আজ বাবা মায়েরা তাদের আদরে ভাগ বসাচ্ছে।
সন্ধ্যায় সবাই তৈরি হয় বাইরে যাবে একটা রেস্টুরেন্টে কেক কাটবে সবাই মিলে।
অরু আর সুকন্যা মিলে চারুকে সাজিয়ে দিয়েছে ছেলের আনা শাড়ি সাথে মেয়ের আনা গয়না দিয়ে।
তারা দুজনেও কালকের কেনা শাড়ি গয়না পরে নেয়।
অভ্র বউয়ের গলার হার দেখে বুকের বা পাশে হাত রাখে তার কষ্টের টাকা এভাবে বউয়ের গলায় ঝুলছে এটা কি মানা যায়!
চারু এতোকিছু দেখে খুব রাগ করে শুধু শুধু টাকা নষ্ট করেছে এরা সবাই।কি দরকার ছিলো এসব কেনাকাটা করার?
সে মেয়ে আর বউকে বকাঝকা করছে বসে বসে।
কিন্তু তারা সেই কথা শুনলে তো!
তারা ব্যস্ত ছবি তোলায়,প্রায় একঘন্টা ধরে ছবি তুলেছে দুজন, সায়ন এক সময় অধৈয্য হয়ে এক কাপ কফি নিয়ে কর্ণারে গিয়ে বসে।
এই পাগলদের কিছু বলেও যে লাভ নেই এটা এই ক'বছরে সে ভালোই বুঝে গেছে।
কিন্তু অভ্র তো মুখ বন্ধ করে থাকার মানুষ না সে ঠিকই ফোঁড়ন কাটছে আবার কথাও শুনছে।
রাত প্রায় এগারোটা,
সবাই ফিরে এসেছে আজ সায়ন অরু এই বাড়িতেই থাকবে তাই রোদ খুব খুশি এসেই মেঘের সাথে খেলা শুরু করে দিয়েছে।
ফোনে নোটিফিকেশন শুনে অভ্র ফোন হাতে নেয়।কিছু টাকা ওর একাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর একাউন্ট থেকে।
নিচে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ,
"মা যেহেতু দুজনের তাই খরচটাও দুজনই করবো।"
অভ্র একটু মুচকি হেসে সুকন্যার দিকে তাকায়।মেয়েটা একটু তার ছেঁড়া হলেও মনটা ভালো।অভ্র টাকার শোক কাটিয়ে উঠেছে মুহুর্তের মধ্যে।
চারু কয়েকটা বাটি এনে টেবিলের উপর রাখে,যার মধ্যে আছে খেজুর গুড়ের পায়েস।
ছোট বেলায় মা এই দিনে পায়েস রান্না করতো আমিও এখানে আসার পর পায়েস রান্না করতাম,অভ্রর বাবা আমাকে একটা শাড়ি দিতো প্রতিবছর এই দিনে। আজকেও করেছিলাম ভেবেছিলাম কিছু না বলেই তোমাদের দিবো।
কিন্তু আজ তোমরা আজকে আমাকে অনেক সুন্দর একটা দিন উপহার দিয়েছ তার রিটার্ন গিফট হিসেবে এটা রইলো সবাই মিলে খাবে।
কথাটা বলে চারু নিজের ঘরে চলে যায়।সারাদিন অনেক ধকল গেছে আর শরীর চলছে না।
অভ্র একটা বাটি নিয়ে ওঠে যায়,এটা সম্পুর্ণ তার,কিন্তু অরু তো তা হতে দেবে না তাই ভাইয়ের হাত থেকে বাটি ছিনিয়ে নেয়ার জন্য লাফ দেয়।
অভ্র হাত উঁচু করে রাখে তাই সোফার উপর ওঠে নেয়ার জন্য টানাটানি শুরু করে।
অভ্র নিজের ভাগ কাউকে দেবেনা তাই অরুর চুল ধরে টান দেয়,অরুও রেগে ভাইয়ার হাতে কামড়ে ধরে।সাথে চিৎকার চেচামেচি তো আছেই!
সায়ন একটা চামচ এনে সুকন্যার হাতে দিয়ে ওর পাশে বসে।
সুকন্যা একটা বাটি ধরে বসেছিল এবার সায়নও এই বাটি থেকে খাওয়া শুরু করে।
এমন লাইভ পার্ফরমেন্স তো আর মিস করা যায় না!
"গাধাগুলোর মাথায় বুদ্ধির ছিটেফোঁটাও নেই,একটা বাটি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছে,আরে বলদ এদিকে দেখ আরও দুই টা বাটি ভর্তি আছে। থাক ভালোই হয়েছে আমাদের ভাগে বেশি পরেছে।
মায়ের হাতের পায়েস তো না যেন অমৃত!"
সুকন্যার কথায় সায়ন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।
মেঘ রোদ বাবা মায়ের এই রুপ দেখে দুই হাত ধরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে,তারা আর যা-ই করুক খাবার নিয়ে মারামারি করে না এদের চেয়ে তারা অনেক ভদ্র!
#প্রিয়_মা
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

0 Comments
ধন্যবাদ পোস্টটি পড়ার জন্য 😊 আপনার কমেন্ট আমাদের উৎসাহ দেয়।