--“রোহানের মতো হ্যান্সাম ছেলেকে ছেড়ে শেষমেশ একটা টাকলা, সুগার ড্যাডিকে বিয়ে করছিস?”
--“যাই, বলিস রোহানের টাকা থাকলেও চারিত্রিক সমস্যা ছিল ঠিকি,তুই চাইলেই রোহানকে ঠিক করে নিতে পারতি। কিন্তু সুগার ড্যাডির টাকা আছে এর চরিত্র কেমন বলা যাচ্ছে না। শুনেছি আবার বিসিএস ক্যাডার। বেলী ঠিক মতো খোঁজ-খবর নিয়েছিস তো! বলা তো যায় না আগে আবার বউ-বাচ্চা আছে কি-না!”
কথাটা বলে বেলী'র বান্ধবীরা একযোগে মুখ চেপে হাসল। ওদের কটাক্ষ মূলকবাণী শুনে বেলি'র রাগে শরীর রি-রি করে উঠলো দুঃখে আখিঁজোড়া ছলছল করে উঠল! কান্না পেলো। ওরা কী পরিস্থিতি জানে না? জেনেও কীভাবে মজা করতে পারে? ওদের হাসাহাসির মধ্যে বেলীর ভাবী এসে বলল
--“খাওয়া-দাওয়ার দিকে যাও গো তোমরা। আমি বেলিকে একটু খাইয়ে দি।”
--"বিয়ে তো এখনো হলো না আগেই খাবো?"
--“হ্যাঁ কাজীর আসতে না-কি দেরি হবে।”
ঘর খালি হতেই বেলীর অক্ষিকোল দিয়ে অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ল। বেলীর মুখের সামনে খাবার ধরল ওর ভাবী বেলী কাতর কণ্ঠে বলল
--“ভাবী প্লিজ সবাইকে বোঝাও না আমি এই লোকটাকে বিয়ে করব না, লোকটার সাথে আমাকে যায় না। সবাই হাসাহাসি করছে।”
বেলীর ভাবি চম্পা কপট রাগ দেখিয়ে বলল
--“লোকটা আবার কী? কিছুক্ষণ পরই ওর সাথে তোর বিয়ে। এখন এসব কথা কেনো বলছিস? আর ছেলেটা কিসে খারাপ আমারে দেখা।”
--“লোকটার বয়স বেশি। সবাই সুগার ড্যাডির বউ, টাকলার বউ বলছে। আমি ওনাকে বিয়ে করব না।”
--“আস্তে কথা বল, বরপক্ষের লোকজন শুনলে খারাপ ভাববে। আর যার যার ইচ্ছে বলুক ছেলে তো ভালো। দেখাতে কী আসে যায়, টাকাই তোকে সুখে রাখবে।”
--“ভাবী টাকায় সব না। মানুষ আগে চেহারাটা দেখে তাদের দুটো মানুষের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং, রেস্পেক্ট, ট্রাস্ট এগুলোই ইম্পর্টেন্ট।”
--“টাকা থাকলে ওগুলো এমনই চলে আসবে। তাই আর জ্ঞান না দিয়ে খা”
চম্পাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিল বেলি। বেলীর বিয়ের খবর শোনার পর থেকেই সে খুশি সংসারে ননদের হস্তক্ষেপ কে সহ্য করে? যা হবে সামনে দেখা যাবে। এমন ভাগ্যর পরিহাসের জন্য ও-ও কিছুটা দায়ী। সেদিন যদি প্রেমিক উহুম এখন সে প্রাক্তন প্রেমিক রোহানকে একটা মেয়ের সাথে আলিঙ্গনে পার্কে দেখে হাইপার হয়ে সিনক্রিয়েট না করত তাহলে আজ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হতো না। সেই সিনক্রিয়েটের জন্যই বাবা-মা, ভাই-ভাবী নিজের সম্মান থাকতে থাকতে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করতে চাইছে। তা-ও এমন ছেলে যার বয়স বেশি বেলী'র আকাশ সমান অভিমান হলো পরিবারের ওপরে আরেকটা বার কী সুযোগ দিতে পারত না? সে কী দোষ করে ফেলনা হয়ে গেছে, যে তাকে অপাত্রে দান করে দিচ্ছে। এই ওদের ভালোবাসা?
খাওয়া-দাওয়া, বিয়ে, বিদায়ের পাঠ চুকিয়ে যখন নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন মানুষের মুখ কাউকে চেনে না ও বুকটা হু-হু করে উঠল। ওখানে পাড়ার লোকজনের ফিসফিসানি কানে আসল বেলির
--“আবিরের রাজ কপাল কত সুন্দর বউ পেয়েছে দেখেছ।”
--“টাকা থাকলে সুন্দরী বউ উঁড়ে উঁড়ে আসে এমনিতেই বুঝছ সব টাকার খেলা।”
বেলী চিত্ত কেঁপে উঠল। সবাই কী ওকে লোভী ভাবছে? ও মোটেও লোভী না। মাথায় ওর বিভিন্ন কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাসর ঘরে ফুলে সর্জ্জীত খাটে অনুভূতি শূন্য মৃত্যু মানুষের ন্যায় বসে আছে। নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য তখন শব্দ করে আবির এসে ওকে বিনয়ী, নম্রতা কণ্ঠে সালাম দিল। বেলি উঠে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেলে আবির বলল
--“পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে নেই। মুখে সালামই যথেষ্ট।”
বেলি নিম্ন স্বরে মুখে সালাম দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বলল
--“শুরু করুন।”
আবির হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বেলির কথা বুঝতে না পেরে ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল
--“কী শুরু করব?”
আবিরের কথায় বেলী সম্বিৎ ফিরে পেল ওমনি আঁতকে উঠে শুকনো ঢোক গিললো বলল
--“জ্বি, কিছু না!”
--“চেঞ্জ করে, অজু করে আসুন। নফল নামাজ পড়ব দুজনে...!”
আবির কথাগুলো বলতে বলতে থেমে গেলো প্রশ্ন করল “আপনি নামাজ পড়তে পারবেন? কোনো সমস্যা নেই তো?”
লোকটা ওকে আপনি সম্ভদ্ধন করল? কেনো? প্রশ্নটা করতে গিয়েও করল না। লোকটার আচার-আচরণে বেশ অবাকই হলো। বেলী ইতস্তত করে বলল
--“জ্বি সমস্যা নাই। পারব।”
দু'জনে নিরবে নামাজ সম্পাদন করল। নামাজ শেষ করে বেলী বুঝতে পারল না ও এখন কী করা উচিৎ! চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল লোকটার কাছ থেকে কিছু শোনার আশায়। আবির বেলী'র ভাবনার অবসান ঘটিয়ে বলল
--“নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন। কোনো অসুবিধা বা দরকার হলে দ্বিধা করবেন না।”
বেলী মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বিছানার একপাশে গুটি-শুটি মেরে শুয়ে পড়ল। আবির লাইট অফ করে দিয়ে ড্রিম লাইট দিতেই বেলী ভীত হয়ে নিজেকে আরো গুটিয়ে নিল। মিনিট পনেরো পরেও কিছু বুঝতে পারল না পিছনে ফিরে দেখলো আবির বিপরীত মুখী হয়ে শুয়ে আছে। বেলী সস্তীর নিঃশ্বাস ছেড়ে ক্লান্তীতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।
আজ এক সপ্তাহ কাটছে শশুড়বাড়িতে এর মধ্যে রিসিপশনে একদিন বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে। এই ক‘দিনে আবিরের সুশীল-শার্লিন-বিনয়ী ব্যবহারে মুগ্ধ না হয়ে পারল না বেলী। যতোই দেখছে ততোই যেনো মুগ্ধতা, সম্মান বেড়েই চলেছে। তাছাড়াও বাড়ির প্রতিটা মানুষের ব্যবহারই ভালো। আসলেই ভালো না-কি সব সাজানো! প্রথম প্রথম তাদের ব্যবহার বিরক্ত, অভিনয় মনে হলে-ও আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে পারছে আসলেই তারা সুন্দর মনের সুখী মানুষ, সুখী পরিবার। বেলী একটু একটু করে সকলের সঙ্গে মিশে যেতে লাগলে-ও আবিরের সাথে হু-হ্যাঁ-না এই তিনটা শব্দ ছাড়া কথা হয় না। তা-ও আবির যদি না কথা বলে বেলী আগবাড়িয়ে কিছু বলে না।
স্রোতের ন্যায় সময় বহমান দেখতে দেখতে বিয়ের একমাসের বেশি পেরিয়ে গেছে বাড়ির সবার সাথে বেলী সম্পর্কের উন্নতি হলেও আবিরের সাথে তার সম্পর্কের কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যায় না। বাড়ির সদস্য বলতে শাশুড়ি, ছোট ননদ, দেবর। বড় ননদের বিয়ে হয়ে গেছে। আবির সকালে অফিসে যায় রাতে বাসায় ফিরে রাতে দু'জন একই কক্ষে, একই বিছানায় থাকে তবুও তাদের মধ্যে অসীম দূরত্ব। শরীরের নয়, মনের। একটু আগোলেই হাত বাড়ালেই শরীর ছোঁয়া যাবে ঠিকিই কিন্তু কেউ আগায় না। তাদের মধ্যে অদৃশ্য এক লুকোচুরি খেলা চলছে দুজনেই সেটা টের পাই। তাদের এমন অস্বাভাবিক আচার-আচরণ খেয়াল করল আবিরের মা। তিনি খেয়াল করল দুজনেই দুজনের থেকে পালাই পালাই ভাবে থাকে সবসময়। ভেবেছিলেন নতুন বিয়ে লজ্জা পাচ্ছে হয়তো ক'দিন পর ঠিক হবে কিন্তু বিয়ের একমাস পরেও যখন তাদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখল না তখন তিনি বেলীর সাথে একান্ত কথা বলল
--“বেলী মা, তুমি কী জানো, তুমি আমার খুব পছন্দের? আমি-ই তোমাকে নিজে পছন্দ করে ছেলের বউ করে এনেছি। ছেলেকে যখন জিজ্ঞাসা করলাম তার কোনো পছন্দ আছে কিনা ও কী বলল জানো?”
বেলী অসম্মতি জানিয়ে প্রশ্নান্তক চোখে তাকিয়ে রইলো। বোঝার চেষ্টা করছে শাশুড়ী কেনো এসব নিয়ে পড়ল হঠাৎ? তিনি আবার ও বলার শুরু করল
--“বলল ‘তুমি পছন্দ করে আনো সে জেনো তোমার মেয়ে হয়ে থাকতে পারে। আমার ভাই-বোনদের আরেকটা বোন আনো’ তোমাকে আমি আমার ছেলের বউ ভাবি নি নিজের মেয়ে ভেবে এসেছি প্রথম দিন থেকেই। তুমিও আমাকেসহ বাড়ির সবাইকে আপন করে নিয়েছ ঠিকি কিন্তু আসল মানুষটাকে অবহেলা করে যাচ্ছো।”
শাশুড়ির শেষোক্ত কথায় বুঝতে অসুবিধা হলো না বিব্রতবোধ করে মাথা নিচু করে নিল। বেলী জানে আবির নিঃসন্দেহে একটা ভালে মানুষ তবুও কেনো জানি সবটা মেনে দ্বিধার দুয়ার খুলতে গেলেই সে-সব কথাগুলো মাথায় ভেসে আসে।
--“আমি কী বলতে চাইছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ? বিয়ে সম্পর্কেটা পবিত্র হুট করে জড়িয়ে গেলেও এ সম্পর্ক ছাড়া যায় না হুট করে। আমি জানি মা হয়ে ছেলের সংসারে বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার সম্পর্কের মধ্যে ঢোকা উচিৎ নয় তবুও বলব সময় দাও সম্পর্কের। সমস্যাগুলো দু'জন দুজনের মধ্যে মেলে ধরো। দুজনেই সহজ হওয়ার চেষ্টা করো।”
বেলী মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।
--“আমি যে তোমাকেই শুধু কথাগুলো বললাম এমন নয়। সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য উভয় পক্ষেই সম্মতি থাকা উচিৎ। কাল রাতেই আবিরকে আমি একই কথাগুলো বলেছি।”
বেলী মনে মনে একটু চমকে গেলো বোধ হয়। বেলী আবিষ্কার করল এই সামনে বসে থাকা মহিলাটির ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। তার ছেলে হিসেবে আবির কখনো খারাপ হতে পারে না। মায়ের আদর্শ সন্তান সে। বেলী আনমনে হেসে ফেলল। শাশুড়ী তার হাসি দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন।
বেলী যে তার আর আবিরের সম্পর্ক নিয়ে ভাবে না ঠিক তা নয়। সে ভাবে কিন্তু সে ভাবনার কোনো সাহারা-কূল পাই না তার ভবনার বিলিন ঘটে। হতাশা এসে ঝেকে ধরে। শাশুড়ির কথা শুনে অশান্ত মনটা হুট করে শান্ত হয়ে গেলো মন বারংবার বলছে রূপে কী যায় আসে? বয়সের সাথে সাথে তার রূপ ও তো ক্ষয়ে যাবে তখন কী আবির ওকে অবহেলা করবে? দূরে ঠেলে দিবে? তখন ওর কী হবে? কোথায় যাবে? বাপের বাড়ি যে সে এখন মেহমান ফিরে গেলে ভাবী অশান্তি করবে। এমন না যে ওর নিজে রোজগার করে খাওয়ার ক্ষমতা নেই। সে ক্ষমতা আছে। কিন্তু এবাড়ির মানুষগুলোর প্রতি ওর কেমন মায়া জন্মে গেছে। মন বলে উঠল আর আবির তার প্রতি-ও মায়া জন্মেছে? হয়তো!
আবির বাড়িতে আসলে বেলী কথা বলতে কেমন আনইজি লাগছিল। ইতস্তত করে বলল
--“আপনার প্রতিদিন এতো দেরি হয় কেনো? একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারেন না?”
আবির আবির্ভূত হয়ে তাকালো বেলীর দিকে প্রতিদিন-ই সম্পর্কটা একটু সহজ করার চেষ্টা করে ও-ই কিন্তু বেলীর কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এড়িয়ে চলে। আবিরকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বেলীর ইতস্ততবোধ হুরহুর করে বাড়তে লাগল অসস্থিরতায় ললাট বেয়ে চিকন অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আবির বলল
--“হঠাৎ ঘামছেন কেনো? শরীর খারাপ লাগছে না-কি?”
বেলী জিহ্বা দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল
--“না না ঠিক আছি। আপনি বিয়ের আগে তারাতাড়ি ফিরতেন বিয়ের পরেও কদিন তাড়াতাড়ি ফিরতেন আর এখন তাড়াতাড়ি ফিরেন না কেনো?”
আবির কী বলবে খুঁজে পেল না সে তো এমনি দেরি করে ফিরে বেলী ওকে দেখলে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে তাই দেরি করে ফিরে বিভ্রান্তিতে পড়ে বলল
--“আজকাল কাজের চাপটা একটু বেশি যাচ্ছে তাই আর কি!”
--“ওও আপনার সময় হবে কবে?”
--“কেনো বলুন তো?”
বেলী নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে হুট করে নিঃসংকোচ করে বলে ফেলল
--“এমনিতেই আপনার সাথে বেড়াতে যেতাম। আপনার সাথে তো কখনো বেড়াতে যাওয়া হয় নি।”
বেলীর হঠাৎ বদল যেনো আবিরের হজম হচ্ছে না ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে বেলীকে। বলল
--“এই শুক্রবার ছাড়া ছুটি হবে না।”
--“ আচ্ছা তাহলে ঐদিন বিকালে বের হবো।”
কথাগুলো বলে বেলী রুম থেকে বেড়িয়ে আসল। আবিরের দৃষ্টি সীমানার বাইরে এসে যেনো হাফ ছেড়ে নিঃশ্বাস ছাড়ল এতোক্ষণ যে কত বহু কষ্টে কথাগুলো বলেছে সেটা ও-ই ভালো জানে।
~শুক্রবার বিকালবেলা~
আবির বেলীকে ডাকতে রুমে এসে দেখল তার অর্ধাঙ্গিনী নীল রংয়ে নিয়েকে সাজিয়েছে। তার নাম বেলীফুল হলেও দেখতে লাগছে অপরাজিতা ফুলের মতো। এই ক’দিকে দুজনের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যেকোনো সম্পর্কে বন্ধুত্বটা খুবই জরুরি। আবিরকে দেখে বেলী বেডের ওপর থেকে নীল রঙের পাঞ্জাবিটা এগিয়ে দিয়ে বলল
--“এটা পড়ে আসুন।”
আবির বিনাবাক্য ব্যয়ে পাঞ্জাবিটা পড়ে এসে খেয়াল হলো শাড়ি আর পাঞ্জাবিটা কপাল সেট। আবির-বেলীকে এই প্রথম বেড়াতে যেতে দেখে আবিরের মা খুবই খুশি হলেন। আবির রাস্তায় বেড়িয়ে বলল
--“কিসে করে যাবেন? বাইক বের করব?”
--“না। রিকশায় চলুন।”
রিকশায় এই প্রথম দুজনে কাছাকাছি পাশাপাশি বসল। টিএসসিতে গিয়ে লেকের পাড়ে বসে বেলী বলল
--“একটা গান গেয়ে শুনান তো!”
--“আমি গান গাইতে পারি না।”
--“কী পারেন?”
আবির উত্তর দিতে পারল না। সত্যিই তো কী পারে ও?
--“আপনি এতো ভদ্রলোক কেনো বলুন তো! ছেলেদের এতো ভদ্র হতে নেই।”
আবির হাসল। বলল “আমি ভদ্র নই। আমি খুবই অভদ্র। আপনি আমাকে মন থেকে মেনে নিলেই আমার অভদ্রতা প্রকাশ পাবে।”
বেলী ভড়কে গেলো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো বলল “মানে?”
সে মানের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। বলল
--“জানেন আপনাকে আমার মা পছন্দ করে এনেছে। আমি বিয়ের আগে আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম আপনি আমাকে বিয়ে করে রাজি কি-না বা আমাকে আপনার পছন্দ কিনা! কিন্তু আপনার ভাবী বলল আপনি আমার সাথে কথা বলতে চান না যা বলার বা শোনার বিয়ের পরে। ওনার কথা বিশ্বাস করা ভুল ছিল আমার আপনার মুখ থেকে শুনতে হতো। বিয়ের দিনই বিষয়টা জানতে পারি আপনার আমাকে পছন্দ নয়। সেই মুহূর্তে পিছিয়ে আশাটা আপনার ও আমার পরিবারের উভয়ের জন্যই সম্মানহানি হতো। তাছাড়া বিয়ে ভেঙে গেলে একটা মেয়ের ওপরেই বেশি ঝড় যায়। আমি এই ক'দিনে রিয়েলাইজ করেছি আপনি আমার সাথে মানিয়ে নিতে চাইছেন। সেটা সত্যি খুবই ভালো। আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু আপনাকে যদি পিছন থেকে কেউ জোর করে আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাদের সম্পর্কটার একটা গতি করে দিতে চাই। তাহলে বলব নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করবেন না প্লিজ।”
বেলী হতভম্ব হয়ে গেলো আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে কী বলা উচিৎ বুঝতে পারছে না সবটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আবির আবার বলল
--“আমি জানি না আমার মা আপনাকে কী বলেছে মা তো সন্তানের সংসারের কথা ভেবেই বলেছে। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমার মা আসলে আমাদের জন্য এতোটা করেছে যে তার ওপরে রাগ জিনিসটা আসে না। আমি যখন মাধ্যমিক দিয়েছি বাবা তখন মারা যায়। আমাদের আর্থিক অবস্থা তখন শোচনীয় পরিবারে বাবাই একমাত্র উপার্জন দাতা ছিলেন সেই চলে গেলো। চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে মায়ের নাজেহাল অবস্থা নিজের কথা না ভেবে আমাদের একটু ভালো রাখার জন্য কী না করেছে। মায়ের কষ্ট দেখে আমিও আয় রোজগার করার চেষ্টা শুরু করলাম। নিজের পড়াশোনাসহ পরিবারে একটু খরচ দেওয়ার চেষ্টা। পাশাপাশি জমিতে চাষ। একটু একটু করে উন্নতি হতে লাগলো। আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেলাম মাকে আর কাজ করতে দিলাম না বোনকে বিয়ে দিলাম। নিজেও বিয়ে করলাম। একথাগুলো বলার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমার মা কিংবা পরিবারের ওপরে আপনার বিরক্ত আসলে আপনি তাদেরকে প্লিজ কটু কথা শোনাবেন না রাগ উঠলে আমাকে যা খুশি বলতে পারেন আমি কিছু মনে করব না।”
আবির আবারও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল
--“আমার বয়সটা কিন্তু এতোটাও বেশি নয় আপনার থেকে আমি নয় বছরের বড় সেটা স্বাভাবিক। আসলে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা, পড়াশোনার চাপ, নিজের যত্ন না নেওয়া সব একসাথে এর জন্য চুলগুলো উঠে গেলো। আমার নিজের ভবিষ্যতের বা নিজের চিন্তা আসত না কখনো।”
বেলী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ আমার এমন আপনিটাকেই পছন্দ। প্রথমে বিয়েটা মেনে নিতে কষ্ট হলে-ও আমি বিয়েটা মেনে নিয়েছি। কেউ আমাকে জোর করে নি। আপনি জানেন, আপনি জানেন আমার একটা প্রেম ছিল। কিন্তু সেখানে মায়া ছিল না। আপনার ওপরে কেনো জানি আমার মায়ার টান হয়। আর মানুষ মায়ায় জড়িয়ে পড়লে আর বের হওয়া যায় না।”
আবির তাকিয়ে রইলো। বেলী আবিরের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল
--“চলুন, খুদা লেগেছে খালি প্রেম আসছে না।”
আবির ডান ভ্রু উঁচু করে বলল
--“আপনি আমার সাথে প্রেম করছেন?”
--“হ্যাঁ বরের সাথেই প্রেম করছি। আর আপনার এই আপনি আজ্ঞে ছাড়েন তো! বউকে কেউ আপনি বলে?”
--“তো কী বলে?”
--“আপনি জানেন না? তুমি বলে।”
আবির বেলীর কানের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল
--“তুমি করে বললে কিন্তু আবিরের ভালোবাসা মাখতে হবে বেলীকে!”
আবিরের কথা বুঝতে বেগ পেতে হলো বেলীকে যখন বুঝতে পারল লজ্জায় মিয়িয়ে গেলো।
~সমাপ্ত~
#অনুগল্পঃ-- #আবির_মাখা_বেলী
#তাসনিম_তামান্না
0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ পোস্টটি পড়ার জন্য 😊 আপনার কমেন্ট আমাদের উৎসাহ দেয়।