এক ঘরহীন পুরুষের প্রেমে

 অণুগল্প #এক_ঘরহীন_পুরুষের_প্রেমে

"হ্যালো!"
অনেকক্ষণ পর ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জবাব এলো। কেউ বেশ বিরস মুখে বলল, "শুনছি।"
প্রায় দু সপ্তাহ পর কৌশিক ফোন করল নিশাকে। স্বরে বিষাদময় অস্থিরতা। ক্লান্তি তার কন্ঠজুড়ে। কয়েকদিনের বিরহ দহনে পুড়ে গলাটা শুকিয়ে যেনো মরুভূমির ন্যায় হয়ে আছে ছেলেটার। তেজি ব্যক্তিত্বের মানুষটার কথা বলার ধরন আজ বড্ড অন্যরকম। এমন রুপ সে কেবল তার প্রিয় নারীটির সামনেই প্রদশর্ন করে অভ্যস্ত।
"ফিরে আসো, নিশা! আজকেও কিচ্ছু খাইনি। ঘরে এসেও শান্তি পাচ্ছি না। আমার খুব খিদে পেয়েছে, তোমার কসম!"
নিশার ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে এলো। ঠোঁট চেপে সহসাই কেঁদে ফেলল মেয়েটা। কিন্তু মুখে থমথমে ভাব বজায় রেখে অতি কষ্টে জবাব দিলো, "সেই সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। আমি বুঝে গিয়েছি, আমাদের অন্তিম অতি নিকটে। জোর করে একা আর কত টানব এই অসুস্থ সম্পর্কটাকে? আমিও তো মানুষ, বলো? ক্লান্তি তো আমাকেও জেঁকে বসে। আর কত!"
কৌশিকের হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে এলো মেয়েটার নিষ্ঠুরতায়। সে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলো। অসহায়ের মতো দাঁতে দাঁত পিষে কাতর গলায় বলল, "আমি মরে যাচ্ছি, নিশু! এমন বিষাক্ত একটা জীবন আমাকে দিতে পারছ কেমন করে! তোমার কন্ঠটা বড্ড অপরিচিত লাগছে। আগের মতো ভালোবাসা টের পাওয়া যাচ্ছে না। আমি খাইনি জেনেও কেমন শক্ত কন্ঠে কথা বলছ। মায়াগুলো কোথায় বাক্সবন্দী করলে, বলো তো? কী চাও তুমি?"
তাচ্ছিল্য করে হাসল নিশা। সে কী চায়, সেসব যদি কৌশিক আদতেও বুঝত, তবে আজ তাদের সম্পর্কের পরিনতি ভিন্ন হতো।
"কিচ্ছু চাই না। মুক্তি দাও।"
আবারও সেই একই কথা! নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না কৌশিক। অযাচিত আবদারে না চাইতেও মাথায় রক্ত চড়ে বসল ছেলেটার। গর্জন করে উঠল সে, "এই বেঈমানের বেঈমান! তোর গলা চেপে ধরব, শুয়োরের বাচ্চা! আজাইরা ঘ্যানঘ্যান করতে বারণ করেছি না? মরার শখ হয়েছে? জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব! একদিনের ঝগড়ার চরটা মনে রাখলি, আর আমার চার বছরের ভালোবাসাগুলো? বাপের বাড়িতে গিয়ে বেঈমানীর খাতায় নাম লিখিয়েছিস? কী না করেছি তোর জন্য? তোকে আদরে রাখিনি? বাইরে যা-ই করি না কেন, তোর সামনে কখনও খারাপ থেকেছি? যখন যা চেয়েছিস, দেইনি?"
"সব দিয়েছ। তোমার যা দিতে ইচ্ছে করেছে, দিয়েছ। কেবল আমার ইচ্ছেটাই কখনও জানতে চাইলে না!"
"কী তোর ইচ্ছে? বল, শুনি।" রাগে অস্থির চিত্তে পায়চারি করছে ঘরময়। ছটফট করছে কৌশিক। মেয়েটাকে সামনে পেলে সত্যি গলা চিপে ধরত। পেয়েছেটা কী এই সর্বনাশিনী? যেচে স্বর্গ দেখিয়ে ইচ্ছে হলেই ছুঁড়ে ফেলা? মুক্তি এতই সহজ?
নিশা কথা বাড়াল না। প্রসঙ্গ বদলে বলল, "রাখছি। হোটেল থেকে খেয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়ো।"
কৌশিক অভদ্র স্বামী। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে নিজের চুল টেনে ধরল সে। রাগলে মাথা ঠিক থাকে না তার। তুই-তুকারি অত্যাবশ্যক। হলোও তা-ই। স্বভাবসুলভ বিশ্রি এক গালি ছুঁড়ে বলে বসল, "এই মীরজাফরের বংশধর! ফোন রাখবি না একদম। মাথায় তুলে আছাড় মারব। বললাম তো তোর কথা শুনব। কী করতে হবে, বল? ঘষেটি বেগমের মতো আচরণ কেন করছিস, নিশু? মাথা গরম হচ্ছে। তুই জানিস, রাগলে আমি ঠিক থাকতে পারি না। না বললে বুঝব কীভাবে? আমার কলিজাটা ভাজাভাজা করে খাবি? কেটে দিবো? কলিজা, ফুসফুস, কিডনি, সব তোর। তা-ও ফিরে আয়!"
শেষের কথাটা কেমন করুণ করে বলল কৌশিক। কণ্ঠে ব্যাকুলতা। অথচ নিশার রাগ টাগ তো সেই কখন উবেছে। এতক্ষণ মিছিমিছি ভান করছিল রেগে থাকার। ছেলেটা কি জানে, তার ফোন পাওয়া মাত্রই তার বোকা বউয়ের মন গলে গিয়েছিল? নিশার স্বামীটার রাগটা একটু বেশি, কথাবার্তার ছিঁড়িত ভালো না। অসভ্য হলেও নিশার সাথে তো সর্বদা নরম থেকেছে। পৃথিবীর সামনে কঠিন থাকা মানুষটা ভালোবাসার দিকটা তো কেবল নিশাকেই দেখিয়েছে। নিশা জানে, কৌশিকের মতো করে আর কেউ ভালোবাসতে পারবে না তাকে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অবাধ্য পুরুষটা বেড়ালের মতো যেভাবে নিশার কাছে বশ হয়, এমন করে আর কেউ তার শাসনের খাঁচায় বন্দী হবে না। চর একটা যদিও মেরেছে। সেটারও কারণ ছিলো। এলাকার পাতি নেতাদের মতো ইদানীং অমুক ভাই, তমুক ভাইদের হয়ে নির্বাচনী প্রচার করে বেড়ায় সে। আবারও জড়িয়েছে এই নোংরামিতে। বেশ কিছুদিন সতর্ক করেও যখন শুনল না, তখন নিশা একদিন বলে বসল, "হয় রাজনীতি ছাড়ো, নয় আমাকে। শখের প্রতি এতই মায়া থাকলে ডিভোর্স দাও। একই কথা বলে বলে বিষাক্ত হয়ে উঠেছি।"
ব্যাস! ঘুমন্ত বাঘকে খেপানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো। খাওয়ার মুখে এই কথাটাই যেনো বিষদাঁত হয়ে বিধল কৌশিকের মস্তিষ্কে। ভাতের প্লেটটা ঠেলে ফেলে দিলো মেঝেতে। হাতের ফোনটা আছাড় মেরে মুহুর্তেই প্রকট রাগে গর্জন করে উঠল তামাটে বর্ণের লম্বাটে পুরুষটা। ফুলদানির আঘাতে টিভিটা ভেঙেছে সে। শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কাছে গিয়ে চেপে ধরল নিশার গাল। চোখ বেয়ে যেনো আগুনের লাভা ঝরছে। গাল দু'টো পিষে ফেলবে এমনি তার ভাব। ফোঁসফোঁস করতে করতে শক্ত কন্ঠে বলল, "কী বললি! আরেকবার বল। কবর দেবো তোকে, বল আরেকবার।"
অকপটে স্বীকার করে বসল মেয়েটা। ভয়ের লেশমাত্র নেই কন্ঠে। "ডিভোর্স দাও। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই আমার।"
কথাটা শেষ করার আগেই প্রগাঢ় থাপ্পড়টা কান গরম করে দিলো নরম দেহের নিশার। শক্তপোক্ত হাতের শক্তির সঙ্গে কুলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল দেয়ালের উপর। মাথাটা ফেটেছে অনেকখানি। অঝোরে রক্ত ঝরছে। কৌশিক ফিরে তাকাল না। চেয়ারে সজোরে লাথি কষে ধুপধাপ পা ফেলে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। রাতে যখন ফিরে এসেছে, ততক্ষণে নিশা আর ঘরে নেই। এমনটা আগে অনেকবার হয়েছে। তবে নিশার গায়ে সে কখনোই হাত তোলেনি। সারাটা রাত অনুশোচনার আগুনে পুড়ে ছটফট করেছে ছেলেটা। দেয়ালে ঘুষি মারতে মারতে রক্তাক্ত করেছে নিজের ওই পাপী হাতটাকেও। কেন সে দুঃসাহস দেখাল নিশার গায়ে আঘাত করার? কত স্পর্ধা তার! নিশা নিশ্চয়ই খুব ব্যথা পেয়েছে? কৌশিক বেরিয়ে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই খুব কেঁদেছে সে? নরম গালটায় কালো দাগ পড়েছে, না? হ্যা, পড়েছেই তো!
সেই সময়ে রাগ করে নিশা বাসা থেকে বেরিয়ে আসলেও পরবর্তীতে হসপিটালে শুয়ে থেকে সে নিজেও নরক দহনে পুড়েছে মানুষটার জন্য। খেয়েছে কি-না, ঘরে ফিরেছে কি-না লুকিয়ে লুকিয়ে কৌশিকের বন্ধুর কাছে এসবের খোঁজ রাখত। সে তো আবার নিশার রান্না ছাড়া ভাত খেতে পারে না। নিশা মাথায় হাত না রাখলে ঘুমাতে পারে না। নিশার নরম বুকে ঠাই না পেলে ছটফট করে। এই উন্মাদ মানুষটার উপর বেশিদিন অভিমান বুকে পুষে রাখার মতো পাথুরে মন কি আর নিশার আছে! যে যা-ই বলুক, যা-ই করুক, নিশা কি এই বখাটে ছেলেটাকে ছেড়ে থাকতে পেরেছে কখনও? এই পাপী লোকটাকে যে সে পাগলের মতো ভালোবাসে। নিশা ছাড়া লোকটার আর কে আছে দুনিয়াতে! কৌশিকের একমাত্র আশ্রয় তো সে-ই। বাইশ বছর বয়সের ছোট্ট মেয়েটাকে ছাড়া সে যেনো কিছুই বোঝে না।
বেয়াদবের মতো মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ভালোবাসার কথা জানানো, হুটহাট ঘরে ফিরে নিশার ঠোঁটে শক্ত চুমু খেয়ে, "আমার মাথা কাজ করছে না। ওমুকের উপর খুব চটে আছি। ধরে দুই ঘা বসাতে ইচ্ছে করছে। তোমার জন্য সেটা পারব না। তাই চুমু খেয়ে রাগ কমাতে এলাম।" বলা মানুষটাকে নিশা খুব ভক্তি করে। এরিয়ে যেতে পারে না। নিজে ভাত বেড়ে না খাওয়া মানুষটা যখন নিশার অসুস্থতায় অস্থির হয়ে পড়ে। রান্নাঘরের বিদিগিস্তা অবস্থা করে অখাদ্য রেঁধে নিশার মুখের কাছে এনে ধরে যখন বলে, "হা করো। আমি রান্না জানি না। যেভাবে পেরেছি, করেছি।" নিশার পৃথিবী থমকে যায়। লোকটা কি জানে? তার ওই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় কত গভীর যত্ন লুকিয়ে থাকে? এই উন্মাদ মানুষটাকে ছেড়ে থাকা নিশার পক্ষে কি আদতেও সম্ভব? কখনও না। কথায় কথায় ভাঙচুর, চেঁচামেচি জুড়ে দিয়ে মাঝরাতে শক্ত এক আলিঙ্গনে তার মতো করে নিশাকে কে বলবে, "আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, নিশু। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না! রাগটা একটু বেশি, হুটহাট খেপে যাই, ভালোও-তো কম বাসি না! তোমাকে কিন্তু ইচ্ছে করে গালাগাল করিনি। স্লিপ অফ টাং। আর হবে না। কী করবো বলো? আদবকায়দা শেখানোর মতো কেউ ছিলো না তো। তুমি একটু শিখিয়ে দিও! আজকের মতো না-হয় মাফ করে দাও, পাখি।"
এমন মায়া করে নিজেকে নত করার পর আর কোনো নারীর হৃদয় কি বেঁকে থাকতে পারে? নিশারও হৃদয়ও পারে না। এই পৃথিবীর সমস্ত মানবমন সভ্যতার পেছনে ছোটে, আর নিশা ছোটে ধনুক চাহুনির এই উসকোখুসকো চুলের পাপী মানুষটার পেছনে। সে না-হয় এই অসভ্য ছেলেটাকে ভালোবেসে জড়াল নিজেকে এক নিকৃষ্ট পাপে। করে বসল ব্যতিক্রমী এক অন্যায়ে। খুব অসুবিধা কি হবে তাতে?
চোখের পানিটুকু মুছে নিশা এবার কঠিন করে শাসানো গলায় বলল, "ওই এমপির হয়ে আর কাজ করবে না, কথা দাও। বিনা কারণে মানুষকে মারধর করবে না। অহেতুক কাউকে ভয় দেখাবে না। তুমি চাইলে আমাদের জীবনটা আবারও রঙীন হয়ে উঠবে। একটা সুখের সংসার হবে। বিশ্বাস করো, আমারও কেউ নেই তুমি ছাড়া। ওসব নামের সম্পর্ক চাই না। তোমাকে চাই শুধু! নিশার জীবনের প্রকৃত আপন মানুষটার নাম 'কৌশিক'। ফিরে এসো, সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসব। তোমার রাগগুলোও সয়ে নিবো। ছেড়ে দাও ওসব সস্তা পলিটিক্স। যে রাজনীতি মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়, আমি আমার কৌশিককে এমন রাজনীতিতে জড়াতে দেব না। শুনো লক্ষীটি, প্লিজ ফিরে এসো তুমি।"
কৌশিক চুপ রইল বেশ কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ পর শান্ত স্বরে বলল, "ছেড়ে দিয়েছি। তুমি যেদিন বাসা ছেড়েছ, সেদিনই ছেড়ে এসেছি চিরতরের জন্য। আমি উপলব্ধি করেছি, রাজনীতির নেশা ছেড়ে থাকা সম্ভব হলেও তোমার নেশা আমি কখনও ছাড়তে পারব না, নিশু। এই নেশা আমায় বাঁচিয়ে রাখে। নিশা না থাকলে কৌশিক মরে যায়। আমি সব ছেড়ে দেব, শুধু তুমি হলেই চলবে এই অধমের। পরশু ইন্টারভিউ দিয়েছি নাসির সাহেবের অফিসে। চাকরিটাও হয়ে গিয়েছে। আগামী সপ্তাহে এলাকা ছাড়ব।"
নিশা কাঁদছে। কৌশিক ধীর গলায় বলল, "আসবে না, নিশু? আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকব!
হু হু করে কেঁদে ফেলল নিশা। ফোনটা রেখে লাগেজ গুছিয়ে বাবা-র সম্মুখে দাঁড়াল সে, "আমাকে একটু বনশ্রীতে দিয়ে আসবে, বাবা?"
মেয়ের মুখের পানে চেয়ে কথা বাড়ালেন না জয়নাল। যা বোঝার, বুঝে নিলেন। মেয়ে আর কথা শুনবে না তার। ওই বখাটেটাকে পাগলের মতো ভালোবাসে কি-না! নিশ্চয়ই গুনধর স্বামী ফোন করে মধুর গীতি শুনিয়েছে। দু'দিন পরপর মেয়েটাকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে পাঠাবে, আবার রবীন্দ্র সংগীত শুনিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করবে। মানুষ হাসাহাসি করে এসব নিয়ে। কোন পাপের শাস্তি তিনি পাচ্ছেন, কে জানে!
দরজায় করাঘাত পড়তেই কৌশিক ফটাফট হাতের সিগারেটটা জানালা দিয়ে ফেলে দিলো। হাত দিয়ে মুখের ধোঁয়া সরিয়ে খুলে দিলো কাঠের দরজাটা। দরজা খুলতেই নিশা ওকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। কথা বলছে না তার বেয়াদব স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই নিশার চোখ চড়কগাছ। সোভার ঘর, রান্নাঘরের হম্বিতম্বি অবস্থা। দেয়ালগুলোতে মাকড়শা জাল বুনেছে অজস্র। ফট করে একটা ইঁদুর দৌড়ে ছুটল কোথায় যেনো। নিশ্চয়ই রান্নাঘরের জানালাগুলো বন্ধ করা হয়নি এতদিন। বাথরুমের বালতিতে নিশা শার্ট ভিজেয়ে রেখেছিল দু'টো। ওগুলো একইভাবে আছে। পঁচা গন্ধ ছুটছে সেখান থেকে। তার সাজানো, গোছানো সংসারের এমন বেহাল অবস্থা দেখে মেয়ের চরম বিস্মিত হলো বটে। বিরক্তি নিয়ে তাকাল কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ভোলাভালা মুখটার পানে। অতি নিষ্পাপ চোখে চেয়ে আছে কৌশিক। আহারে! মাসুম বাচ্চাটা! হতাশ শ্বাস ফেলল নিশা। বিছানাটা পর্যন্ত গোছায়নি খাটাশ লোকটা! লাগেজটা কার্ণিশে রেখে শাড়ীর আঁচল কোমরে বেঁধে প্রায় আধাঘন্টা ধরে ঘর গোছালো সে। কৌশিক তখনও অপরাধীর মতো এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। যেনো কথা বললেই ঘর পরিস্কার না করার অপরাধে বউয়ের ঝাড়ুর বাড়ি পিঠে পড়বে তার।
ঘরের কাজবাজ শেষ করতে করতে প্রায় মাঝরাত নিশার। আসার আগে মা রান্না করে লাগেজে ভরে দিয়েছিলেন কিছু খাবার। নিশা সেগুলোই গরম করে টেবিলে সাজাল। কৌশিক তখনও দাঁড়িয়ে একইভাবে। বিরক্ত হলো নিশা
"এখন কি পাশে বসার জন্য নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে পাঠাতে হবে?"
ভদ্র ছেলের মতো চুপচাপ এসে পাশের চেয়ারটা টেনে বসল কৌশিক। নিশা মনে মনে হাসল। আঁড়চোখে তাকাল তার ব্যক্তিগত পুরুষটার পানে। দু সপ্তাহের অবহেলায় দাঁড়ি বেড়েছে অনেকটা।মুখটা ফেঁকাসে লাগছে। চুলগুলো হয়েছে আরও এলোমেলো। কী হাল করেছে নিজের! মায়া হলো নিশার। কৌশিক তাকাল তার দিকে। নিশা ওর চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলল, "কী জংলী অবস্থা! কালকে চুল- দাঁড়ি কাটিয়ে আসবে।"
লক্ষী বাচ্চার মতো মাথা দোলালো কৌশিক। নিশা ভাত মেখে মুখে ধরল ওর। তৃপ্তি করে খেলো ছেলেটা। যেনো কতকালের ক্ষুদার্ত সে। নিশা মায়ার চোখে চেয়ে শুধাল, "আরও একটু ভাত নেই?"
এবারও মাথা দোলালো কৌশিক। অর্থাৎ, সে আরও খেতে চায়। বেশ কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বুকের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়ল। শার্টটা খামচে ধরে অকস্মাৎ কেঁদে ফেলল নিশা। কৌশিক হকচকাল। নিজে কোনো দোষ করল কি-না ভেবে এক হাতে ওকে বাহুতে টেনে বলল, "কাঁদছ কেন? এই মেয়ে, আমি শুধরে যাব তো। শোনো, নিশু!"
নিশার কান্নার গতি বাড়ছে। তাকাতে পারছে না মানুষটার মুখের পানে। তাকালেই হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। খিদে উবে গেলো কৌশিকের। খাবার গুছিয়ে নিশার হাতটা ধুয়িয়ে দিলো। ভারহীন দেহের মেয়েটাকে কোলে নিয়ে খাটে বসিয়ে দিলো। নাক টানছে নিশা। কৌশিক মুখের সামনে পানি ধরে বলল, "খাও।"
নিঃশব্দে পানিটুকু শেষ করল নিশা। কৌশিক স্বাভাবিক হতে সময় দিলো ওকে। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, "আমি সংসার করতে চাই তোমার সাথে, নিশা। সুস্থ সংসার। ঘরে একটা পরিবর্তন আসা দরকার। চারটা বছর তো হলো, আর কত?"
নিশা বিভ্রান্তি নিয়ে চেয়ে রইলো।
"বাবা ডাক শুনব। আমাকে একটা পরিবার দেবে, নিশু?"
প্রায় মিনিট কয়েক লাগল কথার অর্থ বুঝতে নিশার। যখন বুঝল, তার চোখের পানি বাঁধ মানছে না। কৌশিক ঘাবড়াল।
"তুমি বাচ্চা চাও না? তাহলে থাক। আমাদের বাচ্চা লাগবে না।"
নিশা ঠোঁট ভেঙে কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলল, "আমাকে জড়িয়ে ধরো। এক্ষুণি ধরবে। একঘন্টার আগে ছাড়লে খুন করব তোমায়।"
হেসে ফেলল কৌশিক। শক্তপোক্ত বুকে আগলে ধরল নিশার নরম দেহটাকে। মাথায় হাত বোলালো সারারাত। গভীর করে শ্বাস ফেলে বলতে আরম্ভ করল,
"আমার জীবনটা কখনও এত গোছানো ছিলো না, নিশু। না আমি কখনও এতটা গোছানো ছিলাম। ভবঘুরে চড়ে কী খেলাম, না খেলাম সেসবের খোঁজ কেউ রাখেনি কোনোদিন। মাতাল হয়ে পথেঘাটে পড়ে থেকেছি। হাজত ছিলো আমার একমাত্র বাসস্থান। রীতিমতো একটা জংলী প্রাণীর মতো টিকে ছিলাম।
নিশা হাসল।
"কিন্তু তুমি আসার পর সব সিস্টেমই কেমন করে যেনো বদলে গেলো। আমার বেয়াড়া জীবনে রঙীন প্রজাপতিরা বসবাস করতে শুরু করল। ছন্নছাড়া এই আমিটার একটা ঘরের মতো ঘর হলো। আমাকে কেউ একজন ভীষণ যত্ন গুছিয়ে রাখল, সামলে রাখল। নয়তো কবেই তো বনেজঙ্গলে মরে পড়ে থাকতাম! কুকুরের দল খাবলে খেলেও খোঁজ করার মতো একটা মানুষ থাকত না। কিছু বছর পাড় হলে খুব সহজভাবেই কৌশিক নামটাকে পৃথিবী ভুলে যেতো। একরাশ অপ্রাপ্তি নিয়ে পরপারে পাড়ি জমাতাম।"
থেমে কেমন করে যেনো হাসল ছেলেটা।
"কিন্তু এখন সেই আক্ষেপ নেই। এখন তো মরতেও ইচ্ছে হয় না। ভীরুদের মতো মৃত্যুকে ভয় করতে শুরু করেছি আমি। হাজার বছর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়,নিশু। আমি মরে গেলে একজন খুব কাঁদবে জেনে বেঁচে থাকার স্বাদটা যেনো শতগুণ বেড়ে গেলো। পৃথিবী যাকে অবহেলা করেছে, তার মৃত্যুর শোকে একটা নিষ্পাপ রমণী ক্ষয়ে ক্ষয়ে জিন্দা লাশ হয়ে যাবে। মজার বিষয় হচ্ছে,তোমার স্বামীর জন্য কেউ কখনও দোয়া করেনি। সবসময় মনে হতো, নরকই বোধহয় এই অধমের জন্য অবধারিত। অথচ এখন সেসব মনে হচ্ছে না। স্বর্গের লোভ মস্তিষ্কে জেঁকে বসেছে কিঞ্চিৎ। ফজরের নামাজ শেষে তোমার দীর্ঘ এক মুনাজাতের সবটা জুড়েই তো আমি পাপী থাকি। শিউরে বসে কত কত দোয়া পড়ে সারা গায়ে যখন ফু দাও, আমি অবাক হই। বিস্ময় নিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। সেই তুমি আমার মৃত্যুতে নিজের ভাগের পুণ্য এই পাপীকে দিয়ে দেওয়ার অসম্ভব আবদারটুকু যে সৃষ্টিকর্তার নিকট করে বসবে না, এ আমি বিশ্বাস করি না। বিধাতা যার জন্য নরক লিখে রেখেছিলেন, তুমি তার জন্য স্বর্গ চেয়ে ব্যাকুল হয়ে কাঁদবে। সে কি এই এতিমের জন্য কম পাওয়া, বলো? তুমি তো বেঁচে থেকেই আমায় স্বর্গ দেখিয়ে দিলে! আচ্ছা, স্বর্গ কি এরচেয়েও সুখের?"
"এসব বলতে হয় না। পাপ হয়।"
হাসল কৌশিক। চোখ বুঁজে গাঢ় করে শ্বাস টেনে বলে,"আবর্জনায় পড়ে থাকা ঘরহীন ছেলেটার জন্য ভাগ্যিস 'নিশা' নামক তুমিটা ছিলে...! নয়তো কী হতো আমার?"
নিশা শক্ত করে ওর পিঠের শার্ট খামচে ধরল। যেনো এক্ষুণি বুকের মধ্যে ঢুকে পড়বে লোকটার। হিচকি তুলতে তুলতে ভাঙা গলায় আবদার করল, "আমাকে আদর করো। অনেক আদর করো।"
কৌশিক হাসল মৃদু। দুষ্টুমি করে বলল, "কেমন আদর লাগবে? গালে, ঠোঁটে চুমু খেলে চলবে? নাকি দুই থেকে তিনে প্রমোশন হওয়ার মতো আদর?"
কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল নিশা। হাসল কৌশিকও। এতক্ষণে যেনো প্রাণ ফিরে এলো দু'টো মানুষের তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে। ওরা খিলখিল করে হাসল সারাটা রাত। পৃথিবী জানুক, সব পাপীর জীবনে ধ্বংস লেখা থাকে না। কেউ কেউ আশীর্বাদস্বরুপ মাঝপথে এমন নিশাদের পায়। যারা পাপের খাতায় নাম লেখানো এসব ঘরহীন মানুষদের বিনা দ্বিধায় শক্ত করে আলিঙ্গন করে নেয়। ভালোবাসা দিয়ে, মমতা দিয়ে বাঁচিয়ে নেয় সমস্ত ধ্বংস থেকে। তাকে দেখে নাক সিটকিয়েছে উঁচু দালানের কত বড় বড় লোকেরা। দূর থেকে নজরে পড়তেই দৌড়ে পালিয়েছে এলাকার বুড়ো, শিশুর দল। যেনো মানুষ নয়, সে এক জীবন্ত দানব। কই, নিশা তো কখনও পালায়নি। নিশা যেনো তার মাঝেই খুঁজে নিয়েছে সবচেয়ে অপূর্ব সঙ্গকে। সৃষ্টিকর্তার নিয়তির লেখনী কত দুর্দান্ত, কৌশিকদের মতো মানুষরা এমন-ই ক্রান্তিলগ্নে এসে বুঝে যায়। নয়তো স্রোতের বিপরীতে গিয়ে পাড়ার সবচেয়ে ভদ্র মেয়েটার প্রেমে কি পড়ত কৌশিক? তাকে বউ বানানোর চিন্তা করত কখনও? বিপরীতে সে-ও সাড়া দিত? বাপের বাধ্য মেয়ে কয়েক দিনের প্রেমেরর জন্য কলঙ্ক রটিয়ে একটা বখাটে ছেলের হাত ধরে মাঝরাতে ঘর ছাড়ত? এই ইহজীবনে নিশার মতো করে তাকে কে, কবে বিশ্বাস করেছে! ছিঁড়েখুঁড়ে স্বার্থ উদ্ধার করা দুনিয়ায় নিশা যেনো অনবদ্য কিছু। নিশা তার একমাত্র ঘর। নয়তো জেনেশুনে একটা পাপীকে এমন মায়া করে কে বুকে জায়গা করে দিতো সে ছাড়া? ভাগ্যিস, পৃথিবীর সমস্ত নিয়মের নাম ছিলো অনিয়ম!
নিশা একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে বুকের মাঝে। যেনো পৃথিবীর সমস্ত ধ্বংসাত্মক চাহুনি থেকে একমাত্র নিরাপদ বক্ষে সে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। কৌশিক আরেকটু দৃঢ় করল হাতের বাঁধন। পিঠে আঙুল বুলিয়ে চুমু খেলো অর্ধাঙ্গিনীর তপ্ত কপালে। তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা তৃপ্তিময় নোনাজল কি গড়িয়ে পড়ল নিশার মুখে? পড়ল বোধহয়!
[ কিবোর্ডে আঙুল বুলিয়ে ইঁদুরের মতো ছোট্ট একটা গল্প লিখে ফেললাম। রিচেক দেইনি। কেমন হলো, জানাবেন কিন্তু।🥹]।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ