বাইশ বছরের খুশবুর স্বামী মারা গেছে একসপ্তাহ হলো ও তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাবার বাড়ির সকলে বাচ্চাটাকে এ্যাবশন করে ফেলে দেওয়ার জন্য দু'দিন হলো চাপ দিচ্ছে বাচ্চাটার জন্য তারা অল্পবয়সে স্বামী হারা মেয়েটাকে অন্যজায়গায় বিয়ে দিতে বেগ পোহাতে হবে। এদিকে শশুরবাড়ির সকলে তাদের ছেলের অংশটাকে রাখতে চায়। এই নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে একটা ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। খুশবু প্রাণহীন রোবটের মতো তা দেখে যাচ্ছে। কেউ জিজ্ঞেসা করে না খুশবু কী চাই! তারা যা চাই তাই যেনে খুশবুর জবাব। তবে ও কিছু বলে না বলতে ইচ্ছে করে না। ও মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে বাচ্চাটা রাখবে।
চোখের সামনে ভেসে উঠলো আয়মানের হাস্যেজ্জ্বল মুখখানি। যে দিন খুশবু জানতে পেরেছিল সে অন্তঃসত্ত্বা খুশির চেয়ে ভীতি হয়ে শুধু কেঁদে ছিল দু'দিন কাউকে কিছু জানায় নি। সকলে প্রথম প্রথম তার কান্নায় সহানুভূতি দেখালেও ভেবেছিলো খুশবু পাগল হয়ে গেছে বিরক্ত হয়ে গেছিলো। কিন্তু আয়মানের মাঝে একবিন্দু বিরক্তির লক্ষ্মণ দেখা যায় নি। সে খুশবুর মন ভালো করতে তার সব পছন্দের খাবার এনেছিল। অনেকে তা দেখে হিংসায় আদিখ্যেতা বলেছিলো। খুশবুর আরো কান্না পেলো সে কখনো প্রেম করে নি হঠাৎ এতো ভালোবাসা পেয়ে মনের কোণে হারিয়ে ফেলার ভয় জেগেছিল সে যদি মরে যায়। আয়মান কী আবার বিয়ে করবে! কি সব উদ্ভট কথা ভেবে কেঁদেকুটে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এদিকে আয়মান বার বার জিজ্ঞেসা করছে “কী হয়েছে কিছু তো বলো। না বললে বুঝব কীভাবে!”
ও সাহস সঞ্চয় করে জানালো “নতুন একজন আসছে।”
ও অবুঝের মতো শুধালো “কে আসছে?”
–তুমি বাবা হবে, আমি মা।
আয়মান সে কথা শুনে চমকে উঠলো “এতো তাড়াতাড়ি!”
ওতোটুকু কথা শুনে খুশবুর আবারও কান্না চলে এলো। আয়মান বোকাবোকা চোখে তাকিয়ে রইল খুশবু কান্নারত গলায় বলল “আমি আসলে জানি না কোথা থেকে কী হয়েছে বিশ্বাস করো। তুমি রাগ করো না প্লিজ।”
আয়মান কিছু বলল না খুশবুর পেটে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করলো ওর কান্না থেমে তাকালো কিছুক্ষণ পর গরম তরল অনুভব করতে হকচকিয়ে উঠে বলল “তুমি! তুমি কী কাঁদছো? তুমি কী বেশি কষ্ট পেয়েছ?”
আয়মান কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে বলল “খুশবু, তুমি খুব বোকা। সন্তানের আগমনে বাবারা কখনো কষ্ট পায়?”
–তাহলে কাঁদছো কেনো?
–খুশিতে। তুমি এতো কাঁদলে কেনো?
–ভয়ে!
–ইশশ! আমার বাচ্চা বউটা অনেক কষ্ট হবে তোমার!
–তোমার খুশির জন্য আমি সব কষ্ট হাসি মুখে মেনে নিব সাথে তুমি আছো তো। ও তোমার আর আমার ভালোবাসার প্রতিক।
তারপর আয়মানের নিত্যদিনের নতুন নতুন পাগলামি শুরু হলো। সে সর্বদা বউয়ের ভালো-খারাপের খেয়াল রাখতো। মাঝরাতে উঠে ওয়াশরুমে গেলেও সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনতো “তুমি ঠিক আছো, সব ঠিক আছে?”
খুশবু রাগারাগি করে বলতো “কী সমস্যা কী তোমার পৃথিবীতে তুমি একাই বাবা হচ্ছো? সারাদিন কাজে ছুটে খেটেখুটে বেড়াও। রাতের বেলায় বউ বাচ্চা চৌকি দেওয়া চাকরি শুরু করছো।”
–আমার ভয় তুমি কীভাবে বুঝবা!
–হ্যাঁ, সে-ই! তোমার এতো ভালোবাসা দেখে সবাই হিংসা করে।
–কে হিংসা করে তুমি?
–উহুম, আমার ভয় হয়।
–কিসের ভয়?
–ভালোবাসা হারানোর।
–আর আমার তোমাকে হারানোর।
–যদি আমি মরে যায় তুমি আবার বিয়ে করবে?
–তোমার কিছু হবে না, ইন-শা-আল্লাহ!
–ধরো হয়ে গেলো।
–বাজে বকো না, মাথা খারাপ হয়ে যায় আমার।
–তুমি তো এমনিতেই পাগল।
–হুম, তোমার পাগল বর। আর তুমি আমার পাগলি।
নতুন নতুন বাবা হচ্ছে পাগলামির শেষ নেই। তবে তার পাগলামি খুশবুর সুখ বেশিদিন সইলো না তার কপালে শকুনের দৃষ্টি পড়েছিলো তার ছোট সংসারে!
খুশবু সেসব মধুময় সুখের দিনের কথা ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে পানি গড়ালো। এহেন সময় তার ভাবনায় ছেদ ঘটলো ভাবীর ডাকে রিনা বলল “এতো কেঁদে কী হবে? এই কয়েকদিনে কী কম কেঁদেছ? কেঁদে কী পেলে?”
ও ঘোলাটে চোখে তাকালো ভাবীর দিকে। রিনা বিরক্ত হয়ে বলল “উঠে গুছিয়ে নাও হসপিটালের যাবো।”
খুশবু চমকে উঠে বলল “কেনো!”
–জেনেও ঢং করছ না-কি! সকলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাচ্চার দরকার নেই। আবার বিয়ে করে বাচ্চা নিও!
–আমি তো কোনো সিদ্ধান্ত জানাই নি! আমি বাচ্চাটা রাখবো। নিঃপাপ প্রাণটাকে হত্যার মতো পাপ করে শান্তি পাবো না।
রিনা হইহই করে উঠে বলল “কী বলো এগুলো! সমাজে স্বামীহীন বাঁচা কত কঠিন জানো তুমি! তার ওপরে বাচ্চাটাকে রেখে আরো মুসিবত বাড়াচ্ছ।”
–মায়ের কাছে সন্তান কখনো মুসিবত হয় না।
–এসব ডায়লগ বাজি চিপায় পড়বা তখন আর আসবে না। আসবে তো আমার জামাইয়ের ঘাড়ে এসেই পড়বে। শুনো, এসব বাচ্চা ফেলে বিয়ে করে সংসার করো। আমার সংসারে আমি কোনো ঝামেলা সহ্য করব না।
খুশবু অবাক হয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল “তোমাকে এতোদিন বোনের মতো ভালোবেসে এসেছি আর তুমি এই…আসল রূপ দেখিয়ে দিলে?”
–কীসের আসল রূপ যা সত্যি তাই বলছি। আমার জায়গায় তুমি থাকলে এমনই করতে তাই কথা না বলে তাড়াতাড়ি রেডি হও।
ও জোরেশোরে শ্বাস ছেড়ে বলল “কোথাও যাবো না। গেলে একেবারে কবরে যাবো।”
–আম্মা, আম্মা। এদিকে আসুন আপনার মেয়ে রাজি হচ্ছে না।
ছেলের বউয়ের ডাকাডাকিতে খাদিজা বেগম এলেন সাথে এলেন খুশবুর ফুপু রাজিয়া সুলতানা মেয়ের ওপরে খুবদ্ধ হয়ে বলল “যাবিনা মানে কী! তাড়াতাড়ি রেডি হ।”
ও অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে বলল “আমি মা হয়ে সন্তানকে কীভাবে হত্যা করবো, আম্মু তুমি আমাকে অন্তত বুঝো।”
–বাচ্চাসহ মাকে কে বিয়ে করবে? বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসলে তারই কষ্ট। তোরও কষ্ট।
–তোমরা কেনো আমার কথা বুঝতেছ না। আমি এটা কিছুতেই করতে পারব না। আমাকে দায়া করো।
বলেই শব্দ করে কাঁদতে লাগলো। উপস্থিত তিনজন রমনী ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় এক পুরুষ কণ্ঠের আগন্তুক বলল “বাচ্চাসহ বাচ্চার মাকে আমি বিয়ে করতে প্রস্তুত।”
সকলে চমকে তাকালো। রাজিয়া সুলতানা ছেলের কাছে গিয়ে বলল “কী বলছিস এসব!”
রিনা বিরক্ত হয়ে বলল “সাইমন ভাই, সিরিয়াস সময় মজা মোটেই ভালো না।”
–মজা নয় সিরিয়াস।
–বাচ্চাসহ বিয়ে করলে আপনার নামে রটানো কথাটায় কিন্তু সত্যি বলে প্রমাণিত হবে। বুঝে শুনে কাজ করবেন ভাই।
চলবে…
#উঁচকপালি_খুশবু||সূচনা পর্ব||
#তাসনীম_তামান্না

0 Comments
ধন্যবাদ পোস্টটি পড়ার জন্য 😊 আপনার কমেন্ট আমাদের উৎসাহ দেয়।